দেশজুড়ে যেন অদৃশ্য এক আতঙ্কের নগরী তৈরি হয়েছে। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি, বাসস্ট্যান্ড, এমনকি আবাসিক এলাকাও এখন খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর কিশোর গ্যাংয়ের দখলে চলে যাচ্ছে, এমন অভিযোগ সাধারণ মানুষের। দিনের আলোতে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত, মোটরসাইকেল আরোহীদের অস্ত্রের মুখে ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুলি, আবার কোথাও বাড়িতে ঢুকে ডাকাতি, সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনমনে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও চেকপোস্ট বাড়ানো হলেও দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোথায় দুর্বলতা রয়ে গেছে?
পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ডাকাতি, দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ ও নারী-শিশু নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের মামলা হয়েছে ১৩ হাজারের বেশি। গড়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন থানায় শতাধিক মামলা দায়ের হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করেছে সশস্ত্র ছিনতাই। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরে মোটরসাইকেলচালিত সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মালিবাগ, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী ও মিরপুর এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সম্প্রতি আগারগাঁও এলাকায় শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে এক নারীকে কুপিয়ে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
শুধু ছিনতাই নয়, প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। কোথাও কুপিয়ে হত্যা, কোথাও গুলি করে খুন, অপরাধের ধরনও হয়ে উঠছে আরও ভয়ংকর। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভয় কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ। এরই মধ্যে গত রোববার বিকেলে রাজধানীর মান্ডা এলাকা থেকে মুকাররম নামে এক সৌদি প্রবাসী ৭ টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। সংস্থাটির দাবি, পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পরকীয়া প্রেমিকা ও বান্ধবী মিলে সৌদি প্রবাসী মোকাররমকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে মরদেহ সাত টুকরা করে ময়লার মধ্যে ফেলে দেন।
অন্যদিকে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধ বাড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, এমনকি হত্যার মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। সম্প্রতি আদাবর এলাকায় ‘রক্ত চোষা জনি গ্রুপ’-এর সদস্য ‘পাংখা রুবেল’ গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে ভয়ংকর তথ্য। তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এর আগেও গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে বর্তমানে তিন ধরনের ছিনতাইকারী সক্রিয়, পেশাদার সংঘবদ্ধ চক্র, মাদকাসক্ত কিশোর এবং কিশোর গ্যাংভিত্তিক অপরাধী। কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ সিএনজি বা প্রাইভেটকার ব্যবহার করে অপরাধ করছে। অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে রাজধানী থেকে অন্তত ১ হাজার ১০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই নানা অপরাধে প্রায় ৭০০ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে অন্তত ২০০ জন ছিল ছিনতাইকারী। কিন্তু এত গ্রেপ্তারের পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় হতাশ সাধারণ মানুষ।
ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তারের পর অনেক অপরাধী দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি ও বেকারত্বও অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। একই সঙ্গে সামাজিক অবক্ষয়, পরিবারে নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়াকেও দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সবসময় প্রস্তুত। সাম্প্রতিক সব আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে। তিনি আরও বলেন, জামিনে বের হওয়া চিহ্নিত সন্ত্রাসীদেরও গতিবিধি নজরদারিতে রাখছে পুলিশ।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকার নাগরিকের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, মাদক বিস্তার, বেকারত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক অপরাধী এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে চক্র গড়ে তুলছে। আবার কিশোরদের মধ্যে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতাও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বড় কারণ হয়ে উঠছে।
জানতে চাইলে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়ায় তরুণদের একটি অংশ সহজেই অপরাধজগতে ঢুকে পড়ছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি এখন শহর ছাড়িয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে।
অপরাধ বাড়লেও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক মামলার তদন্ত শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম সম্প্রতি বলেছেন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও খুন বন্ধে পুলিশকে শতভাগ চেষ্টা করতে হবে। অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, শুধু নির্দেশনা বা অভিযান দিয়ে কি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? নগরজীবনে নিরাপত্তাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাতের পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। গণপরিবহনে যাতায়াতকারী নারী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আতঙ্ক বাড়ছে।
বিশেষ করে ঈদ সামনে রেখে ছিনতাই ও ডাকাতির আশঙ্কা আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা ও নগদ অর্থ লেনদেন বাড়লে অপরাধচক্রও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হলেও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি কমছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র গ্রেপ্তার অভিযান নয়, অপরাধের মূল কারণ দূর করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ, তরুণদের কর্মসংস্থান, দ্রুত বিচার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশা এখন দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে উঠেছে। কারণ, মানুষ চায় এমন একটি সমাজ, যেখানে গভীর রাতে ঘরে ফিরতে ভয় পেতে হবে না, হাসপাতালে যাওয়ার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হতে হবে না, কিংবা সামান্য দ্বন্দ্বে প্রাণ হারানোর আশঙ্কায় থাকতে হবে না। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, খুন-ছিনতাইয়ের ভয়াবহ বিস্তারে সেই স্বাভাবিক জীবনই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম।