দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়ায় শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক বাতা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আক্রান্ত শিশুরা সেরে উঠলেও তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া ও স্নায়বিক জটিলতার মতো গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
দেশে গত দেড় মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ৪২ হাজার ১৫৯ জন। এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে।
সংক্রমণের লাগাম টানতে গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী বৃহৎ পরিসরে আরও একটি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এই কার্যক্রমের প্রভাবে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকেই পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ্য করা যাবে এবং মে মাসের মধ্যেই হাম পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
হাম পরিস্থিতি ও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম প্রথমেই শিশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর আঘাত হানে। যদিও রোগ সেরে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরে আসে, তবে এই সময়টায় শিশুর শরীর খুব দুর্বল থাকে এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তিনি জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের মুখে ঘা হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা, যার কারণে তারা ঠিকমতো খেতে পারে না এবং ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। একইসঙ্গে শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি তৈরি হয়, যা চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে চোখে স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গিয়ে চোখ শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং কর্নিয়া ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে কর্নিয়ায় ঘা সৃষ্টি হয়ে তা অন্ধত্বের কারণও হতে পারে।
হাম কখনো কখনো শিশুর মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক জটিলতা, এমনকি খিঁচুনির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া কানে সংক্রমণ হয়ে কান পেকে যেতে পারে, যা চিকিৎসা না করালে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অনেক শিশুই হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এতে ফুসফুসে ক্ষত বা দাগ তৈরি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্ট ও কাশির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি হামের পর অনেক শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগে, যা তাদের সার্বিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এসব জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে শিশুর খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডা. আবিদা হাসান মোল্লা। তিনি বলেন, শিশুর খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকা জরুরি। শুধু মাছ-মাংস নয়, অন্যান্য উৎস থেকেও প্রোটিন সরবরাহ করা যেতে পারে; এর ফলে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী অনেক জটিলতা থেকে শিশু সুস্থ থাকবে।
চোখের সুরক্ষায় ভিটামিন ‘এ’-এর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি লালশাক, পালংশাক, শালগম ও মিষ্টিকুমড়ার মতো খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি ৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস অন্তর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, বাচ্চার বয়স কম হলে হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের দুধের বিকল্প নেই। ছয় মাসের কম বয়সী অনেক শিশু আক্রান্ত হয় যাদের হামের টিকা প্রদান করা সম্ভব হয় না। এ সকল শিশু মায়ের দুধ থেকে প্রচুর পরিমাণে ইমিউনোগ্লোবুলিন (আইজিএ) প্রোটিন পেয়ে থাকে। এই প্রোটিন বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। তাই শিশুদের যেকোনো রোগ প্রতিরোধে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই।