সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। এ নিয়ে মোট ১২৪তম বারের মতো প্রতিবেদন দাখিল স্থগিত হলো। নতুন করে আগামী ১ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমান।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) নির্ধারিত তারিখে তদন্ত সংস্থা আদালতে কোনো প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় বিচারক নতুন তারিখ ধার্য করেন। একইসঙ্গে দীর্ঘসূত্রতার কারণ জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ (কারণ দর্শানোর নির্দেশ) করেছেন আদালত। আগামী ধার্য দিনে তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে কেন এখনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
আদালতের এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরেবাংলা নগর থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) রফিকুল ইসলাম রাসেল। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ মামলায় প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ একের পর এক পিছিয়ে যাওয়ায় আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট, মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনস (পিবিআই)-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক আদালতে হাজির হয়ে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানান। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত ৭০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি আদালতকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে দ্রুতই তদন্ত শেষ করা সম্ভব হবে। তবে তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সেদিনও আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তারও আগে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে পিবিআইকে দায়িত্ব প্রদান করেন। সেই অনুযায়ী নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পুনরায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি।
২০১২ সালের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড : ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। দেশের সাংবাদিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা এ হত্যাকাণ্ড আজও অমীমাংসিত।
ঘটনার পর নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রথমে থানা-পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও চার দিনের মধ্যে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-তে হস্তান্তর করা হয়। ডিবিও দুই মাসের বেশি সময় তদন্ত করেও রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল র্যাব তদন্তভার গ্রহণ করে। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করলেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
গ্রেপ্তার, কিন্তু রহস্য অমীমাংসিত : এই মামলায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন- কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, পলাশ রুদ্র পাল, আনামুল হক ওরফে হুমায়ুন কবির এবং তানভীর রহমান খান। বর্তমানে তানভীর রহমান খান ও পলাশ রুদ্র পাল জামিনে রয়েছেন, অন্যরা কারাগারে আছেন। তবে এত গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ তদন্ত সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত হত্যার মূল কারণ বা পরিকল্পনাকারীদের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি, যা মামলাটিকে দেশের অন্যতম দীর্ঘসূত্রতা ও আলোচিত তদন্তে পরিণত করেছে।
দীর্ঘ অপেক্ষা, বাড়ছে প্রশ্ন : সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। আদালতের শোকজ আদেশের ফলে তদন্ত সংস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী ১ এপ্রিল নির্ধারিত তারিখে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেবেন, এবার কি মিলবে তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি, নাকি আবারও দীর্ঘ অপেক্ষার পালা, সেই দিকেই তাকিয়ে আছে দেশজুড়ে সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ।