রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি রাখাইন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুইভাবেই এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংলাপের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এটি শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর সমাধানে জাতীয় ঐকমত্য, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সব পক্ষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় সরকার ‘হোল অব গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, সমাজকল্যাণসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি কাজ করছে।
রাখাইনের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু প্রচলিত কূটনৈতিক তৎপরতায় এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। এ কারণে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি রাখাইনের স্থানীয় নিয়ন্ত্রক শক্তি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে চীন, ভারত ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ চলছে।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নানা সংকটে পড়ছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, কক্সবাজারে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বেড়েছে। সীমান্তে মাদক ও মানবপাচার, শরণার্থী শিবিরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ এবং বাংলাদেশি জেলেদের আটকের মতো ঘটনাও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিনি জানান, দেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিশুর জন্ম হচ্ছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে সংকট মোকাবিলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘে উত্থাপিত প্রস্তাবের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। পাশাপাশি রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও নতুন শরণার্থী সংকটের মধ্যেও রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার অনুরোধ করেন প্রতিমন্ত্রী।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক, অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক এবং নীতি গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ড. শাকিল আহমেদ।