চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার ও কার্পেটিংয়ের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিম্নমানের ইট, বালু ও পাথর ব্যবহার করে দায়সারাভাবে কাজ করা হচ্ছে। এমনকি বিটুমিন ঢালাইয়ের তিন দিন পর হাত দিয়ে চাপ দিলেই তা উঠে আসছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কাজের মান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগের মুখে থাকা সড়কগুলো হলো আমিলাইশ ব্যাংক মাঠ-হিলমিলি-কাঞ্চনা হাইস্কুল সড়ক, এওচিয়া ইউপি থেকে আমিলাইশ হাটভাঙ্গা সড়ক এবং ফুলতলা থেকে খোদার হাট সড়ক। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে নিম্নমানের কাজ চলতে থাকলে উদ্বোধনের অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কগুলো আবার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কে বিটুমিন ঢালাইয়ের তিন দিন পার না হতেই হাত দিয়ে চাপ দিলে তা উঠে আসছে। নির্মাণসামগ্রীর মানও সন্তোষজনক নয়। প্রথম শ্রেণির ইট ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে নিম্নমানের ইট ও পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে।
অনিয়মের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাঞ্চনা আমিলাইশ বঙ্গ চন্দ্র ঘোষ ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক মাহফুজুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালে ফুলতলা থেকে লতাপির বাজার পর্যন্ত যে কার্পেটিং করা হয়েছিল, এক বছর না যেতেই তা উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। বর্তমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও চরম অনিয়ম করছে। সরকারি অর্থের এমন অপচয়ে রাজস্বের ক্ষতি হচ্ছে, আর লাভবান হচ্ছে দুর্নীতিবাজ চক্র।
কাঞ্চনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও কৃষকসহ হাজারো মানুষ চলাচল করেন। বিশেষ করে কাঞ্চনা হাইস্কুলগামী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য সড়কটি সংস্কার করা জরুরি। কিন্তু কাজের এমন গাফিলতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমিলাইশ ৪ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় মাদ্রাসাশিক্ষক নুরুল ইসলাম হেলালি বলেন, দেশের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে সেই অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে জনগণের অর্থ অপচয় করা হচ্ছে। সরকারের উচিত দ্রুত সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং কাজের মান নিশ্চিত করার পর বিল পরিশোধ করা।
ডলুকুল এলাকার বাসিন্দা রিজিয়া সুলতানা বলেন, তাঁদের এলাকার সড়ক নির্মাণে যেভাবে নিম্নমানের ইট, পাথর ও বালু ব্যবহার করা হচ্ছে, তা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও যদি এমন অনিয়ম চলে, তাহলে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জনদুর্ভোগ বাড়বে। তিনি অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শনের দাবি জানান।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মী জোবাইর বীন জিহাদি বলেন, হিলমিলি সড়কসহ প্রকল্পের তিনটি কাজে মোট ১০ কোটি ৫ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কাজের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম দেখা গেছে। বিটুমিনের মান এতটাই নিম্ন যে হাত দিয়েই তা তুলে ফেলা যাচ্ছে। ব্যবহৃত ইটও নিম্নমানের। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতি অনুসরণ করছে না। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলীর (এলজিইডি) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘সাইক্লোন আম্পান’ প্রকল্পের (২০২৪-২০২৫ অর্থবছর) আওতায় তিনটি পৃথক সড়কের সংস্কারকাজ চলছে। সড়কগুলো ও বরাদ্দের পরিমাণ হলো—
১. এওচিয়া ইউপি থেকে আমিলাইশ হাটভাঙ্গা সড়ক: বরাদ্দ ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার ২০৮ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শাহ দরবেশিয়া অটোমোবাইল, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
২. আমিলাইশ ইউপি থেকে কাঞ্চনা হিলমিলি সড়ক (৩.৫ কিলোমিটার): বরাদ্দ ৩ কোটি ৩১ লাখ ৫ হাজার ৪৯১ টাকা। প্রাক্কলিত ব্যয় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আই. অ্যান্ড জে. জেবি, আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম।
৩. ফুলতলা থেকে খোদার হাট সড়ক: বরাদ্দ ৪ কোটি ৯০ লাখ ২৭ হাজার ৭৯৪ টাকা। প্রাক্কলিত ব্যয় ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বসুন্ধরা আটলান্টিক মেরিন, কুড়িগ্রাম সদর।
কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও ফোন নম্বর গণমাধ্যমকর্মীদের দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে স্থানীয় এলজিইডি কার্যালয়। এ কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, সাতকানিয়ার সড়ক উন্নয়নে বরাদ্দ করা কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জনগণের অধিকার রক্ষায় নির্মাণকাজে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে টেকসই কাজ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগের প্রতি দাবি জানান তিনি।
অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে সাতকানিয়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, তাঁদের দল মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কাজ তদারকি করছে। বিটুমিন ঢালাইয়ের পর তা শক্ত হতে বা যথাযথভাবে জমাট বাঁধতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। তিন দিনের মাথায় হাত দিয়ে টানলে তা উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়। তবে কাজের কোথাও ত্রুটি পাওয়া গেলে ঠিকাদারকে দিয়ে পুনরায় কাজ করানো হবে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ নেই। এমন অভিযোগের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, সরকারি উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই। বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। কাজের শতভাগ গুণগত মান নিশ্চিত করতে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন বলেন, উন্নয়নকাজে অনিয়ম, গাফিলতি বা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। সাতকানিয়ার তিনটি সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজে অনিয়মের অভিযোগকে তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত দল গঠন করে দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। তদন্তে কাজের মান খারাপ পাওয়া গেলে বা নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল স্থগিতসহ কঠোর আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শতভাগ টেকসই ও মানসম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও টেকসই সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করতে কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কঠোর ও নিরপেক্ষ তদারকির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।