ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করাসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাভার ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। শ্রমিক আন্দোলন, সড়কে অবস্থান ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার মধ্যে দুই এলাকায় অন্তত ৮০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাভারে অর্ধশতাধিক এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অন্তত ৩০টি কারখানা রয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলেও দুপুরের দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শ্রমিকেরা বিভিন্ন এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি পিকআপ ভ্যান ও পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
সকালের দিকে সাভার ও আশুলিয়ার অধিকাংশ পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে নিশ্চিতপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপের কারখানা এবং ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন।
বেলা পৌনে ১১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা। এ সময় তাঁরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে পাশে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানায়। পরে শ্রমিকেরা সড়কের পাশে অবস্থান নেন এবং শারমিন গ্রুপের শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শারমিন গ্রুপের কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া একই এলাকায় হা-মীম গ্রুপ, নিউএইজসহ আশপাশের একাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার ও আশুলিয়ার অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন কারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন জানান, কাজ বন্ধ রেখে কারখানায় অবস্থান করা একাধিক শ্রমিক তাঁকে জানিয়েছেন, তাঁদের দাবির বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের কেউ কথা বলছেন না। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, সাধারণত কাজ বন্ধ থাকার কারণে কোনো কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলে দাবির বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না পেয়ে শ্রমিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে সড়কে অবস্থান নেন। পরে অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। এ পরিস্থিতি এড়াতে শ্রমিকদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে সকাল ১০টার দিকে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ে পাশে থাকার পাশাপাশি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে একটি পিকআপ ভ্যান ও পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রবিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারায় গাড়িটি পুড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে আগুন দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আন্দোলনরত শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে।
কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল কারখানার গোডাউনে আগুন দেওয়ার খবর তাঁরা পেয়েছেন। তবে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারছেন না।
এর আগে সকালে কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পর তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং ছুটি ঘোষণা করা হয়।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে কারখানার সামনে ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার অভাব এবং আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় শিল্পাঞ্চলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্তত ৮০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণার ফলে উৎপাদন কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ, আলোচনা এবং শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।