চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় রায়পুর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বঙ্গোপসাগরের ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকা দুই ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে তাই নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, টেকসই এই বাঁধ নির্মাণ শেষ হলে দীর্ঘদিনের ভাঙন আতঙ্ক কমবে, সুরক্ষিত হবে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি প্যাকেজে মোট ৫ দশমিক ১৭৫ কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পাউবোর তত্ত্বাবধানে রায়পুর ইউনিয়নে ২ দশমিক ৭৭৫ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা ও বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় সিসি ব্লক দিয়ে তীর সংরক্ষণ, বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং টেকসই মাটির ঢাল নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব কাজ শেষ হলে সামুদ্রিক ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়পুর ইউনিয়নে ২ দশমিক ৭৭৫ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে এক কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি অংশের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ।
২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিবছর বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নোনাপানি প্রবেশের আশঙ্কায় তাঁদের দিন কাটে। জলোচ্ছ্বাসের পানিতে অতীতে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও মৎস্যঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগে তাঁরা আশাবাদী হলেও কাজের গুণগত মান নিয়ে সতর্ক থাকার দাবি জানিয়েছেন।
রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জালাল উদ্দীন আনোয়ারী বলেন, “আমরা উপকূলবাসী একটি টেকসই বেড়িবাঁধ চাই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। অতীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে কাজের মান নিশ্চিত করতে হবে।”
জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের বাসিন্দা প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁদের ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের শিকার। টেকসই বাঁধ নির্মাণের ফলে আগামী কয়েক দশক বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে জনপদটি সুরক্ষিত থাকবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, উপকূলীয় জনপদকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি থেকে রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের কাজের গুণগত মান বজায় রাখার বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে আনোয়ারার উপকূলীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এনামুল হক নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি কাজের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুণগত মান বজায় রেখে প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু নির্মাণ শেষ করাই নয়, নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বাঁধটির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হবে। তাহলেই দীর্ঘদিনের ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় আনোয়ারার উপকূলবাসীর স্বস্তি স্থায়ী রূপ পাবে।