
শেফালী বেগমের এই অর্জন কেবল একটি পরীক্ষায় পাসের ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, শেখার আগ্রহ ও অধ্যবসায় থাকলে বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
জানা যায়, শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল সম্ভাবনাময়। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক সংকটের কারণে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো ফল করলেও একসময় বই-খাতার পরিবর্তে কাঁধে তুলে নিতে হয় সংসারের দায়িত্ব। পরবর্তী সময়ে স্বামী-সন্তান ও পরিবারের নানা দায়িত্বের মধ্যে চাপা পড়ে যায় নিজের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন। তবে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কখনো হারাননি তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর স্বামী ও তিন সন্তানের উৎসাহ ও সহযোগিতায় আবারও পড়াশোনা শুরু করেন শেফালী। বয়সের ব্যবধান, সংসারের ব্যস্ততা ও দীর্ঘদিনের শিক্ষাবিরতি উপেক্ষা করে নিয়মিত পড়াশোনায় মনোযোগী হন। অবশেষে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মেলে তাঁর সেই অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি।
শেফালী বেগমের ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। তাঁর মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। সন্তানদের শিক্ষাজীবনেও শেফালীর ত্যাগ ও অনুপ্রেরণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের নানা পরিস্থিতির কারণে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বরাবরই ভালো ফল করেছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে ভাগ্নি ও ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা দেখে নিজের মধ্যেও আবার লেখাপড়া করার ইচ্ছা জাগে। স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি। আজ জিপিএ ৪.২১ পেয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।’
তাঁর স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, ‘শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাঁর এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তাঁর পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।’
শেফালী বেগমের নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজের কাছেও দাদি এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক। সে বলে, ‘আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।’