
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সেন্টমার্টিনে পর্যটক চলাচলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বীপটিতে পর্যটকেরা ভ্রমণ করতে পারবেন। এ সময়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ পাবেন। পর্যটকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
পর্যটন চালুর এ সিদ্ধান্তে দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে পর্যটকদের নিরাপদে ওঠানামা নিশ্চিত করতে জেটির পন্টুন মেরামত এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
সেন্টমার্টিনের মানুষের আয়ের বড় একটি অংশ পর্যটন ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যটন মৌসুম বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়। দীর্ঘদিন পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ এবং রাতযাপনের সুযোগ সীমিত থাকায় এসব ব্যবসায় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন মৌসুমে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে সেই সংকট কিছুটা কাটবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
সেন্টমার্টিন মারমেইড রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, “দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমনকি দিনাতিপাত করতেও অনেক কষ্ট হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে জাহাজ চলাচল করবে শুনে স্বস্তি লাগছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর আকাশ বলেন, সেন্টমার্টিনে বছরে মাত্র দুই থেকে তিন মাস পর্যটন ব্যবসা ভালো চলে। এ সময়ের আয় দিয়েই পুরো বছর চলতে হয়। এর মধ্যে বৈরী আবহাওয়া ও বিভিন্ন বিধিনিষেধ দ্বীপের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে লাভের মুখ দেখার আশা করছেন তিনি।
পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। কোথাও পুরোনো স্থাপনা মেরামত, কোথাও ছাউনি ও বেড়া পরিবর্তন, আবার কোথাও চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার কাজ। এসব কাজের জন্য শ্রমিক নিয়োগের অনুমতি চেয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করছেন ব্যবসায়ীরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে পর্যটন ব্যবসায়ীরা তিন শতাধিক আবেদন করেছেন। যাচাই-বাছাই শেষে আবেদনগুলোর বিষয়ে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। পর্যটক আসার আগেই এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কারকাজ শেষ করতে তৎপরতা চলছে।
এদিকে পর্যটকদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চললেও জাহাজ ভেড়ানোর জেটির পন্টুনের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, পন্টুনে মরিচা ধরে বিভিন্ন স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরুর আগে এটি মেরামত করা না হলে যাত্রীদের ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দ্বীপের বাসিন্দা শাকের আলম বলেন, “দীর্ঘ সময় পর ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে। জেটির কাজ শেষ হলেও জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই পন্টুন মেরামত করা প্রয়োজন।”
সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির দায়িত্বে থাকা আব্দুর রহমান বলেন, পর্যটকদের আগমন শুরু হলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাণ ফিরবে। এতে পর্যটননির্ভর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মেরামত ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। আগামী মাসে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার আগেই জেটির পন্টুন মেরামত করা জরুরি।
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে জেটি নির্মাণের কাজ চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এখনো কিছু কাজ বাকি থাকলেও পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরুর আগে প্ল্যাটফর্মের কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়। জেটি নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
সেন্টমার্টিনে পর্যটন চালুর পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।