করতোয়া নদীতে সেতু নেই, নৌকাই ভরসা—ঝুঁকি নিয়ে পারাপার তিন উপজেলার লাখো মানুষের

পীরগঞ্জ (রংপুর) সংবাদদাতা

সারাদেশ

এক পাড়ে বাড়ি, অন্য পাড়ে জমি। এ পাড়ে স্কুল, ওপারে বাজার। কখনো অসুস্থ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়, কখনো মাঠের

2026-10-25T17:17:05+00:00
2026-10-25T17:17:05+00:00
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
করতোয়া নদীতে সেতু নেই, নৌকাই ভরসা—ঝুঁকি নিয়ে পারাপার তিন উপজেলার লাখো মানুষের
পীরগঞ্জ (রংপুর) সংবাদদাতা
রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
এক পাড়ে বাড়ি, অন্য পাড়ে জমি। এ পাড়ে স্কুল, ওপারে বাজার। কখনো অসুস্থ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়, কখনো মাঠের ফসল পৌঁছাতে হয় বাজারে। কিন্তু মাঝখানে বয়ে চলেছে করতোয়া নদী। পারাপারের ভরসা সেই নৌকা, কখনো বাঁশের সাঁকো, আবার কখনো অনিশ্চিত অপেক্ষা। একটি সেতুর অভাবে এভাবেই বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রংপুরের পীরগঞ্জ, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট উপজেলার লাখো মানুষ।

জীবিকার তাগিদে, পড়াশোনার প্রয়োজনে কিংবা চিকিৎসা নিতে প্রতিদিনই নদী পার হতে হয় তাঁদের। নৌকায় চড়ে গরু-ছাগল, ভ্যান, রিকশা, মোটরসাইকেল ও কৃষিপণ্যও পারাপার করা হয়। এতে একদিকে যেমন সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, করতোয়া নদীর ওপর থাকা ১১টি ঘাটের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে তিনটি স্থানে বড় সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বাকি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলোতে এখনো স্থায়ী সেতু গড়ে ওঠেনি। ফলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলোর মধ্যে রয়েছে সাতপাড়া, কুমারপুর, কুয়েতপুর হামিপুর, কুলানন্দপুর, বড় আলমপুর ইউনিয়নের হোসেনপুর, রামনাথপুরের শালকেদহ, শালপাড়া এবং টুকুরিয়া ইউনিয়নের যাতের ঘাট। এসব ঘাট দিয়ে প্রতিদিন তিন উপজেলার অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন।

নদীতে পানি বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। তখন নৌকায় পারাপারের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়। কিন্তু বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই নদী পাড়ি দিতে হয় স্থানীয়দের।

নদী পারাপারের এই দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি অসহায় করে তোলে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষদের। কোনো রোগীকে দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও ঘাটে নৌকা বা মাঝি না থাকলে অপেক্ষা করতে হয়। কখনো নৌকা থাকলেও পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের চেয়ে বেশি সময় লেগে যায়।

চতরা ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, তাঁর গ্রামের বাড়ি করতোয়া নদীর তীরে হওয়ায় নদী পারাপারের দুর্ভোগ তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও অনেক সময় ঘাটে নৌকা থাকলেও মাঝি পাওয়া যায় না। আবার মাঝি ও নৌকা থাকলেও অপেক্ষা করতে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরাও সময়মতো পণ্য মোকামে নিতে পারেন না। এসব সমস্যা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলোতে সেতু নির্মাণ করা জরুরি। এতে কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ উপকৃত হবেন।

করতোয়া নদীর দুই পাড়ে রয়েছে তিন উপজেলার মানুষের কৃষিজমি। চাষাবাদ থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপেই অনেক কৃষককে নদী পার হতে হয়। স্থায়ী সেতু না থাকায় উৎপাদিত ফসল পরিবহনে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে তাঁদের।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর ওপর সেতু নির্মাণ হলে কৃষকেরা সহজে ফসল বাজারে নিতে পারবেন। পণ্য পরিবহন সহজ হবে, কমবে ভোগান্তি, বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ। পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সেবায় মানুষের যাতায়াতও সহজ হবে।

নদী পারাপারে যাত্রীদের নির্ধারিত ভাড়া দিতে হয়। এরপরও অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় নৌকার জন্য। যাত্রী পর্যাপ্ত না হলে মাঝিরা অনেক ক্ষেত্রে নৌকা ছাড়তে চান না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক ও সাধারণ যাত্রীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

পথচারী মোনারুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও মাজেদুল ইসলাম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলোতে সেতু বা পুল নির্মাণ করা হলে মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে। বর্তমানে নদী পারাপারে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল পরিবহনে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

একটি ঘাটের মাঝি জানান, প্রতিদিন নৌকার মাধ্যমে মানুষকে নদী পারাপার করা হয়। এ সময় ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। বড় দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম হলেও নদীতে পানি বেড়ে গেলে ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।

নৌকার মাঝিরা জানান, প্রতিবছর সরকারি নিয়মে ঘাটগুলো ইজারা দেওয়া হয়। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দরদাতাকে এক বছরের জন্য ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে নদী পারাপারের জন্য যাত্রীদের নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ঘাট দিয়ে মানুষের যাতায়াত চললেও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ কবে বাস্তবায়িত হবে? তাঁদের মতে, শুধু নৌকার ওপর নির্ভর করে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, করতোয়া নদীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলোতে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিন উপজেলার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। কৃষক সহজে ফসল বাজারে নিতে পারবেন, ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে পারবেন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত হবে নির্বিঘ্ন। সবচেয়ে বড় কথা, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে নদী পার হতে গিয়ে কাউকে যেন অনিশ্চিত অপেক্ষায় থাকতে না হয়।

করতোয়া নদী তাঁদের কাছে শুধু দুই পাড়ের বিভাজন নয়; প্রতিদিনের জীবন, জীবিকা ও প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতা। সেই নদীর ওপর কয়েকটি স্থায়ী সেতু তাঁদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে পারে—এমনটাই আশা স্থানীয়দের।

এখন তাঁদের অপেক্ষা, কবে শেষ হবে নৌকার ওপর নির্ভরশীলতা, কবে নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগের সুযোগ মিলবে করতোয়া নদীর দুই পাড়ের মানুষের।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: