শিশু কখনো মুরুব্বির কোলে উঠে কান্না করে। সে মুরুব্বির কোলে থাকতে চায় না। মা বকা দিয়ে বলেন, "এই পাজি মেয়ে, অমন করতেছ ক্যান? উনি তোমার নানা হন। নানা তোমাকে কত আদর করেন। কতকিছু গিফট দেন।"
এরপর নানা বাসায় এলে শিশু লুকিয়ে পড়ে, কিংবা সে অসুস্থ বোধ করে অথবা ওয়াশরুমে গিয়ে বসে থাকে। মা-বাবা বুঝতেই চান না শিশু কেন সেই মুরুব্বির কাছে যেতে চাইছে না।
অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় গিয়ে শুনেছি প্রায় সব ছেলে এবং মেয়ে শৈশবে কিংবা কৈশোরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মামাতো, চাচাতো, ফুপাতো ভাই, দুলাভাই, চাচা, মামা, খালু, দাদা, নানা, প্রতিবেশী, পুলিশ, রাখাল, দোকানদার, পাড়ার বড় ভাই, কাকা, মুরুব্বি, শিক্ষক, হুজুর- এমন এক বা একাধিক ব্যক্তি দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এটা আমার প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় শোনা অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে- শিশুরা যাদের নিরাপদ আশ্রয় বলে জানে, তাদের মধ্য থেকেই শিশু নির্যাতনকারী হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় ১৭১ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (JMBF)। এর মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণের এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটি বাংলাদেশের ৮২টি সংবাদমাধ্যম ও প্রকাশ্য সূত্র পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ৭৭ জন ছেলে শিশু বারবার অথবা দীর্ঘ সময় ধরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই সংখ্যা দেশের সব ঘটনার হিসাব নয়। বরং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে আসা ঘটনাগুলোর হিসাব মাত্র। সব ঘটনার হিসাব আরও অনেক বেশি। কত শিশু ভয়, লজ্জা, পারিবারিক চাপ কিংবা অভিযুক্তের প্রভাবের কারণে মুখ খুলতে পারেনি, তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।
বেশির ভাগ ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে হুজুরদের কাছ থেকে- এমন অভিজ্ঞতার কথাও প্রশিক্ষণ সেশনে এবং গবেষণার ইন্টারভিউতে শুনেছি। কারণ একসময় সম্ভবত বাবা-মায়ের এমন বিশ্বাস ছিল যে হুজুররা যৌন কর্মের মতো কোনো গোপন কাজ করা ছাড়াই ঐশ্বরিকভাবে পিতা হয়ে যান। তাই তার কাছে সন্তান নিরাপদ। কারণ হুজুর বলেন, "জেনা করলে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে।"
হুজুর জেনার উদ্যোগ নিলে শিক্ষার্থী যখন সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে, "হুজুর, আল্লাহর আরশ!"
হুজুর তখন বলেন, "চিন্তা করিস না। এত আস্তে দেব যে আল্লাহর আরশ টেরও পাবে না।"
এটা গল্প নয়। আমাদের শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতা। আমাদের অভিভাবকগণ গাছের প্রথম ফল হুজুরকে খেতে দিতেন। পেয়ারা, আনার, পেঁপে কিংবা লাউ- গাছের প্রথম ফলটি হুজুরকে দেওয়া ছিল শ্রদ্ধা ও অগাধ বিশ্বাসের প্রকাশ। সেই শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের মধ্যে কোনো অন্যায় ছিল না। কিন্তু প্রশ্নহীন বিশ্বাস যখন একজন মানুষকে সব ধরনের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তুলে দেয়, তখন বিপদ তৈরি হয়। হুজুরের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি শিশুর ওপর নির্যাতন করে, আর সেই বিশ্বাসের কারণেই অভিভাবক অভিযোগ শুনতে অস্বীকার করেন, তবে শিশুর জন্য ন্যায়বিচারের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক ছেলে শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। শিশুর বাবার অভিযোগ ছিল, সহপাঠীদের নির্যাতনের শিকার হয়ে সে শিক্ষকদের কাছে সুরক্ষা চেয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্তদের মধ্যে শিক্ষকরাও ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্যাতন শুরু হয়েছিল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এবং তা কয়েক মাস ধরে চলেছে।
অক্টোবরেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। গাজীপুরের একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় আট বছর বয়সী এক ছেলে শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে একজন শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে কারাগারে পাঠানোর খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুকে পরপর তিন রাতে নির্যাতন করা হয়। এমন ঘটনা আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে- আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠলে শিশু যাবে কোথায়?
২৪ অক্টোবর ২০২৬-এ মানবাধিকার সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনও মাদ্রাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার ও কুষ্টিয়ায় শিশুদের যৌন নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগের কথা উল্লেখ করে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনগত ব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, ভয়, সামাজিক কলঙ্ক ও চাপের কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সব মাদ্রাসা বা সব ধর্মীয় শিক্ষককে অভিযুক্ত করা যায় না। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার নামে অভিযোগ উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। শিশুকে পরিবার থেকে দূরে রেখে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও বেশি। সেখানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, অভিভাবকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, স্বাধীন তদারকি এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
দিন বদলেছে। ঘটনা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু দিনের পর দিন বিচারহীনতার সংস্কৃতি শিশুধর্ষণকে জিইয়ে রেখেছে। অভিযোগের পর তদন্তে বিলম্ব, প্রভাবশালী অভিযুক্তকে রক্ষা করার চেষ্টা, পরিবারকে নীরব থাকতে চাপ দেওয়া কিংবা অনানুষ্ঠানিক সালিশে ঘটনা মিটিয়ে ফেলার প্রবণতা অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠতে দেয় না।
শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগ উঠলে প্রথম কাজ হলো তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুকে দোষারোপ করা যাবে না, বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করে তার অভিজ্ঞতাকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করা যাবে না। চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনগত সুরক্ষা দিতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
চড় দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর দিগম্বর করবে মানুষ, তারপর মাথা মুড়িয়ে অঙ্গচ্ছেদ শুরু হয়ে যাবে। তখন ভয়াবহতা সামাল দেওয়া মুশকিল হবে।
জনতার এই ক্ষোভের পেছনে বিচারহীনতার অভিজ্ঞতা থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। এতে নিরপরাধ মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন, তদন্ত ও বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে আদালতের মাধ্যমে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, সামাজিক পরিচয়, ধর্মীয় মর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কেউ বিচার এড়াতে পারবে না।
সরকার যদি সত্যি শিশুবান্ধব হয়ে থাকে, তাহলে শিশুধর্ষণের বিচার দ্রুত ট্রাইব্যুনালে করে অতিশিগগিরই রায় বাস্তবায়ন করুন। আমাদের দেশে রায় ঘোষণার স্বল্পতম সময়ে রায় কার্যকরের নজির আছে। তাহলে প্রমাণিত অপরাধীর রায় বাস্তবায়নে সরকারের এত দ্বিধা কেন?
বিচার দ্রুত করার অর্থ শুধু দ্রুত রায় ঘোষণা করা নয়। মানসম্মত তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা, শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইনসম্মতভাবে রায় কার্যকর করাও এর অংশ। কোনো অভিযোগের বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, কিন্তু প্রভাবশালী অভিযুক্তের কারণে বিচার আটকে থাকবে- এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না।
শিশু যখন কোনো মুরুব্বির কোলে যেতে চায় না, তখন তাকে জোর করে কোলে তুলে দেবেন না। সে যখন কোনো শিক্ষক কিংবা আত্মীয়ের কাছে যেতে ভয় পায়, তখন তার ভয়কে অবাধ্যতা বলে উড়িয়ে দেবেন না। তার কথা শুনুন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। শিশুর কান্নার কারণ জানার চেষ্টা করুন।
আমাদের শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতা যেন পরবর্তী প্রজন্মের শৈশব-কৈশোর কেড়ে নিতে না পারে। গাছের প্রথম ফল হুজুরকে দেওয়ার শ্রদ্ধা থাকুক, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত না হয়। ধর্মীয় শিক্ষক, আত্মীয় কিংবা মুরুব্বি- কেউই শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদার ঊর্ধ্বে নন।
শিশুর কান্নাকে অবাধ্যতা ভেবে থামিয়ে দেবেন না। তার কথা শুনুন। আর যারা সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে শিশুর শৈশব কেড়ে নেয়, তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করুন।