পর্যটনশিল্পে মুনাফার দৌড়, উপেক্ষিত মানুষের জীবন

সুজন দে

মতামত

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানি বাংলাদেশের পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন

2026-10-19T13:42:06+00:00
2026-10-19T14:20:36+00:00
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
পর্যটনশিল্পে মুনাফার দৌড়, উপেক্ষিত মানুষের জীবন
সুজন দে
সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪২ পিএম  আপডেট: ১৯.১০.২০২৬ ২:২০ পিএম
সংগৃহীত ছবি

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানি বাংলাদেশের পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কাঠের তৈরি রিসোর্টটি আগুনে প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। এর আগে গত জুনে অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে সতর্কও করা হয়েছিল। তবু রিসোর্টটি চালু ছিল।

এই ঘটনা নিছক একটি রিসোর্টে আগুন লাগার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক তদারকি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে পর্যটকদের যদি নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হয়, তাহলে সেই পর্যটনব্যবস্থাকে টেকসই বলার সুযোগ কোথায়?

ইকো ট্যুরিজমের মূল দর্শন হলো প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটন গড়ে তোলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। জাতিসংঘের পর্যটনবিষয়ক সংস্থা ইউএন ট্যুরিজমের সংজ্ঞাতেও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানো, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপকারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে ইকো ট্যুরিজমের নাম ব্যবহার করে এমন সব স্থাপনা গড়ে উঠছে, যেগুলোর সঙ্গে প্রকৃতি সংরক্ষণের ধারণারই বিরোধ রয়েছে। কাঠ, বাঁশ, খড় কিংবা অন্যান্য স্থানীয় উপকরণ দিয়ে স্থাপনা তৈরি করা নিজে কোনো অপরাধ নয়। বরং যথাযথ পরিকল্পনায় এসব উপকরণ পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, পরিবেশবান্ধব নির্মাণের কথা বলে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমনপথ, অনুমোদন এবং পর্যটকদের মৌলিক নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা।

কাঠের তৈরি স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সেখানে আগুন শনাক্তকরণ যন্ত্র, কার্যকর অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, পর্যাপ্ত বহির্গমনপথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে বিপদ ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ইনানীর সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড সেই ঝুঁকির নির্মম উদাহরণ।

একটি রিসোর্টের নামের আগে ‘ইকো’ শব্দটি বসালেই সেটি পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না। প্রকৃতির ক্ষতি করে নির্মিত স্থাপনা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড এবং মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে পরিচালিত ব্যবসা কোনোভাবেই প্রকৃত অর্থে ইকো ট্যুরিজম হতে পারে না।

দেশের পর্যটনশিল্পে কক্সবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সমুদ্রসৈকত, মেরিন ড্রাইভ, ইনানী, হিমছড়ি ও আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠছে। রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও চালু হয়েছে। পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের আবাসন ও বিনোদনসেবা সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এই অগ্রগতির পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে, পর্যটন অবকাঠামোর প্রতিটি স্থাপনা যেন নিরাপদ, অনুমোদিত এবং পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল হয়। কিন্তু ইনানীর রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং আগেই সতর্ক করার পরও কার্যক্রম চালু থাকার তথ্য প্রশাসনিক তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কক্সবাজারের ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় ছোট-বড় নানা ধরনের রিসোর্ট, কটেজ ও পর্যটন আবাসন গড়ে উঠেছে। তবে দেশে মোট কতটি ইকো রিসোর্ট রয়েছে এবং এর মধ্যে কতটি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে চলছে, তার নির্ভরযোগ্য সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান ছাড়া সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা কঠিন। এই তথ্যের অনুপস্থিতিই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রথমেই প্রয়োজন দেশব্যাপী এসব স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ঝুঁকির হিসাব।

কক্সবাজারের সংকটকে শুধু সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। সিলেট ও মৌলভীবাজারের চা-বাগান, বনাঞ্চল ও জলাভূমি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাহাড়, সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকা এবং হাওর অঞ্চলেও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব এলাকায় পর্যটন স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে পারে। কিন্তু অপরিকল্পিত নির্মাণ সেই সম্ভাবনাকে বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে।

পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে স্থাপনা তৈরি, প্রাকৃতিক পানি চলাচলের পথ বন্ধ করা, বনভূমি ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ—এসব অভিযোগ যেখানে রয়েছে, সেখানে তদন্ত ও আইন প্রয়োগ জরুরি। তবে সব রিসোর্টের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ প্রমাণিত ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না। প্রতিটি স্থাপনার ক্ষেত্রে অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, জমির ব্যবহার এবং নির্মাণের বৈধতা যাচাই করতে হবে।

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পাহাড়ের ঢাল, মাটি ও প্রাকৃতিক বনভূমির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় না নিয়ে স্থাপনা তৈরি করলে ভূমিধস, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাড়তে পারে। সিলেট ও মৌলভীবাজারে জলাভূমি, বন ও চা-বাগানের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। সুন্দরবন এলাকায় পর্যটন পরিচালনায় বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। হাওর অঞ্চলে পর্যটন স্থাপনা ও নৌযান চলাচলের পরিকল্পনাও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

অর্থাৎ অঞ্চলভেদে ঝুঁকি আলাদা হলেও মূল প্রশ্ন একই—পর্যটন থেকে আয় বাড়াতে গিয়ে আমরা যে প্রাকৃতিক সম্পদকে আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছি, সেটিই কি ধ্বংস করে ফেলছি?

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। বিদেশি পর্যটকেরা নিরাপদ আবাসন, মানসম্মত সেবা, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, জরুরি চিকিৎসা এবং বিপদের সময় দ্রুত সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তাও প্রত্যাশা করেন।

একটি রিসোর্টে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলে সম্ভাব্য পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে কক্সবাজারের ভাবমূর্তি ও পর্যটন ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একটি দুর্ঘটনাই দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি পর্যটক আগমনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে তদন্ত, পরবর্তী পদক্ষেপ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির ওপর।

এই সংকটকে আড়াল করার চেষ্টা নয়, বরং স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা অর্জন করতে হবে। কোনো স্থাপনায় অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নিরাপত্তার ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রথমত, কক্সবাজারসহ দেশের পর্যটন এলাকাগুলোর সব রিসোর্ট ও কটেজের জরুরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা করতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভবন বা স্থাপনার অনুমোদন, বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম এবং জরুরি বহির্গমনপথ যাচাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অনুমোদনহীন স্থাপনা ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয়ত, কাঠ ও বাঁশের মতো স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি স্থাপনাগুলোর জন্য ঝুঁকিভিত্তিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা কার্যকর করতে হবে। পর্যটকদের অবস্থানসংখ্যা, স্থাপনার উচ্চতা, রান্নাঘরের অবস্থান এবং জরুরি বের হওয়ার পথ বিবেচনায় নিয়ে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মহড়া এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক করা উচিত।

চতুর্থত, পর্যটন, পরিবেশ, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবসায় সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণেও তাদের ভূমিকা নিশ্চিত করা দরকার। পর্যটকদের জন্যও কোন স্থাপনা অনুমোদিত এবং কোথায় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে, তা জানার সহজ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইকো ট্যুরিজমের নামে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে আপস বন্ধ করা। বাংলাদেশের পাহাড়, বন, সমুদ্র, হাওর ও জীববৈচিত্র্য পর্যটনের সম্পদ। এগুলো ধ্বংস করে কিংবা পর্যটকদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে সাময়িক মুনাফা অর্জন করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা যায় না।

পর্যটনশিল্পকে বাঁচাতে হলে আগে পর্যটকের জীবন বাঁচাতে হবে। আর প্রকৃতির নামে পর্যটন গড়ে তুলতে হলে প্রকৃতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইকো ট্যুরিজমের পরিচয় হবে প্রকৃতির সুরক্ষা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং নিরাপদ ভ্রমণ—মৃত্যুফাঁদ নয়।

লেখক: সাংবাদিক
ই-মেইল: [email protected]



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: