বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েকে একা ছেড়ে দেবেন না

মতামত

সাতক্ষীরায় ১১ বছর ৯ মাস বয়সী একজন শিশুর বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করেছে। শিশু

2026-10-16T17:08:21+00:00
2026-10-16T17:08:21+00:00
  সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েকে একা ছেড়ে দেবেন না
দীপু মাহমুদ
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
সাতক্ষীরায় ১১ বছর ৯ মাস বয়সী একজন শিশুর বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করেছে। শিশু স্থানীয় মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। প্রশাসন তার মা-বাবার কাছ থেকে আর বাল্যবিয়ে না দেওয়ার মুচলেকাও নিয়েছে। একই জেলায় অন্য এক মাদ্রাসার ১৬ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাগুলো প্রশ্ন তোলে, যে বয়সে একজন মেয়ের বিদ্যালয়ে যাওয়া, খেলাধুলা করা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে কেন তার বিয়ের আয়োজন করতে হবে! আর বিয়ে বন্ধ করার পর তার শৈশব, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে?

বাল্যবিয়ে একজন মেয়েকে তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, স্বাস্থ্যগত জটিলতা, পারিবারিক নির্যাতন এবং অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তার সামনে একসঙ্গে চলে আসে। প্রত্যেক মেয়ের অভিজ্ঞতা এক নয়, তবুও এত কম বয়সে বিয়ের ফলে শিশুর বিকাশ ও সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

নিরাপত্তার নামে যে ঝুঁকি

বাল্যবিয়ের পেছনে দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ কাজ করে। কোথাও পরিবারের ধারণা, বিয়ে দিলে মেয়েকে নিরাপদ রাখা যাবে। কোথাও মেয়ের ভরণপোষণের ব্যয় কমানো কিংবা সামাজিক সমালোচনা এড়ানোর চেষ্টা থাকে। আবার মেয়ের চলাফেরা ও কৈশোরের স্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করতেও বিয়েকে সমাধান হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু যে বিয়েকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে মনে করা হচ্ছে, সেই বিয়েই অল্প বয়সের এই মেয়েকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলবে। বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব, অল্প বয়সে মাতৃত্ব এবং শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া তার সামনে দীর্ঘমেয়াদি বাধা তৈরি করবে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পরিবার যে অনিশ্চয়তা থেকে মেয়েকে বাঁচাতে চায়ছিল, বাল্যবিয়ে সেই অনিশ্চয়তাই অন্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

বাল্যবিয়ের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক স্পষ্ট। মেয়েরা পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে নিজ ভবিষ্যৎ গড়ার একাধিক বিকল্প তৈরি হয়। বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হলে বিয়ের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। আবার বিয়ে হয়ে গেলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়। তাই শুধু বিয়ের আয়োজন বন্ধ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়ে বিদ্যালয়ে ফিরতে পারছে কিনা, পরিবার তাকে পপড়াশোনা চালিয়ে যেতে দিচ্ছে কিনা এবং পরবর্তী সময়ে গোপনে বিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা, সেসবও নিশ্চিত করতে হবে।

আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সুরক্ষা

বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, সাধারণভাবে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নারীর ক্ষেত্রে ১৮ বছর এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর। আইনে অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান আছে। তবে আইনের ১৯ ধারায় আদালতের নির্দেশ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া সাপেক্ষে বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ের ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই বিধানের প্রয়োগ যেন শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ উপেক্ষা করে পারিবারিক বা সামাজিক চাপকে বৈধতা দেওয়ার উপায় না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার।

ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই আইন সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আইনের অসংগতি, বাল্যবিয়ে বাতিলের পর্যাপ্ত বিধানের অভাব এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু আইন থাকাই যথেষ্ট নয়, বাস্তবে সেই আইন মেয়েদের কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বাল্যবিয়ের খবর পেলে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, কাজি, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাই কার্যকর করতে হবে, যাতে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিয়ের আয়োজন করা না যায়। অনেক সময় কাজি বলেন তিনি বুঝতে পারেন মেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু তার কাছে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে এমন বার্থ সাটিফিকেট থাকে। তখন তাকে বিয়ে রেজিস্ট্রি করতেই হয়।

কোনো বিয়ে বন্ধ হলে মেয়ের পরিস্থিতি পরবর্তী সময়ে অনুসরণ করা খুব দরকার। তার শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত না করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
এখানে তথ্যদাতার নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী, সহপাঠী, শিক্ষক কিংবা আত্মীয় বিয়ের আয়োজনের খবর জানলেও প্রতিশোধ, সামাজিক বিরোধ বা হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে অভিযোগ করতে চান না। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা ও পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তা না থাকলে বহু ঘটনা আড়ালে থেকে যাবে।

পাশে দাঁড়ানো মানে বিকল্প তৈরি করা

বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা কোনো মেয়েকে কখনো একা ছাড়া যাবে না। তার পাশে দাঁড়াতে হবে। বাল্যবিয়ে বন্ধ বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে। পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু বিয়ের দিন এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করা নয়। বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েকে একা ছেড়ে না দিয়ে, তার পাশে দাঁড়ানো মানে- যে পরিস্থিতি সেই মেয়েকে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে ফেলেছে, তা থেকে মেয়েকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে দেওয়া।

কোনো ছাত্রী হঠাৎ বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করলে, নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে কিংবা তার বিয়ের খবর পাওয়া গেলে শিক্ষকদের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে হবে। মেয়ের সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে কথা বলে তার মতামত শুনতে হবে। যদি মেয়ে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকে তাহলে পরিবারকে বোঝানোর পাশাপাশি প্রশাসনের সহায়তা নিতে হবে। মেয়ে কী চায়, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে এবং তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ আছেন কিনা- এসব না জেনে তাকে একা করে দেওয়া উচিত হবে না। 

দারিদ্র্য বিয়ের কারণ হলে পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা, উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও যাতায়াতের সহায়তা দেওয়ার মতো কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নিরাপত্তাহীনতা কারণ হলে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার পথ, গণপরিবহন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েদের অধিকার ও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে হবে। বিপদের সময় কোথায় সহায়তা চাইতে হবে, তা-ও জানাতে হবে। ছেলেদেরও এই আলোচনায় যুক্ত করা প্রয়োজন, কারণ মেয়েদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সামাজিক ধারণা না বদলালে শুধু মেয়েদের সচেতন করে সমস্যার সমাধান হবে না।

শৈশব রক্ষার দায়িত্ব এড়ানো যাবে না

জাতিসংঘের এসডিজি-র ৫.৩ নম্বর লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়েসহ ক্ষতিকর প্রথা বন্ধের অঙ্গীকার আছে। অথচ ২০২৫ সালেও বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। এত বিপুলসংখ্যক মেয়ের বাল্যবিয়ের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সমস্যা শুধু কয়েকটি পরিবারের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সামাজিক রীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়া এবং সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি জড়িত।

পরিবারকে মেয়ের শত্রু বানিয়ে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা ঠিক হবে না। আবার পারিবারিক সিদ্ধান্ত বলে শিশুর অধিকার লঙ্ঘনও মেনে নেওয়া যায় না। পরিবারের উদ্বেগ বুঝতে হবে, তবে তার সমাধান হিসেবে মেয়ের শৈশব কেড়ে নেওয়া নয়। এখানে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো মেয়ের শিক্ষা, নিরাপত্তা কিংবা ভবিষ্যৎ রক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবে বিয়েকে বিবেচনা করতে না হয়।

কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের আয়োজন হচ্ছে- এমন খবর পেয়ে তড়িঘড়ি সেখানে গিয়ে শুধু বিয়ে বন্ধ করাই শেষ কথা হবে না। দেখতে হবে, সেই মেয়ে নিজের কথা বলতে পারছে কিনা, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সকল ব্যবস্থা আছে কিনা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে কিনা। একজন কিশোরীর পাশে দাঁড়ানো মানে তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে সহায়তা করা।

বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েকে একা ছেড়ে দেবেন না- এটা কেবল মানবিক আহ্বান নয়, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বের দাবি। প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন মেয়েদের শৈশব আর আগামী রক্ষার জন্য শেষ মুহূর্তে বিয়ে বন্ধ করতে ছুটতে হবে না। বরং বাল্যবিয়ের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই মেয়ের শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত থাকবে।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: