মানুষের হয়ে নয়, মানুষের সঙ্গে: ইলা মিত্রের উত্তরাধিকার

মতামত

১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে নাচোলের কৃষক আন্দোলন দমনে পুলিশি অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তার হন সাঁওতাল কৃষকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

2026-10-14T16:18:52+00:00
2026-10-14T16:18:52+00:00
  সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
মানুষের হয়ে নয়, মানুষের সঙ্গে: ইলা মিত্রের উত্তরাধিকার
দীপু মাহমুদ
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে নাচোলের কৃষক আন্দোলন দমনে পুলিশি অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তার হন সাঁওতাল কৃষকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ইলা মিত্র। কারাগারে তাঁর ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। রাজশাহী আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ইলা মিত্র জানান, ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি রোহনপুরে গ্রেপ্তারের পরদিন তাঁকে নাচোলে নেওয়া হয়। পুলিশ তাঁকে মারধর করে, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বিবস্ত্র করে আটকে রাখে। খাবার তো দূরের কথা, এক ফোঁটা পানিও তাকে দেওয়া হয়নি। বন্দুকের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করায় তাঁর নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। জবানবন্দিতে তিনি আরও বর্ণনা করেন, কীভাবে তাঁকে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল। যে কৃষকেরা জমিতে ফসল ফলাতেন, তাঁরাই ফসলের ন্যায্য হিস্যা চাইতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিলেন। নাচোলের এই ইতিহাসে ইলা মিত্রের ভূমিকা তাই শুধু সাহসের নয়, এটা এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানের ইতিহাস, যেখানে সমাজের ক্ষমতাহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হয়ে উঠেছিল মুখ্য।

ইলা মিত্র দেখিয়েছেন, প্রান্তিক মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে নেতৃত্ব মানে তাঁদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়- তাদের শক্তি, কণ্ঠস্বর ও নেতৃত্বকে সামনে আনার পথ তৈরি করা। মুক্তি কেউ কাউকে দিয়ে দেয় না- মানুষ তা নিজেরাই অর্জন করে। আমাদের কাজ সেই সংগ্রাম দখল করা নয়, মানুষের পাশে থেকে তাকে এগিয়ে নেওয়া।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে তেভাগা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কৃষকেরা উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ নিজেদের ঘরে তোলার দাবি জানিয়েছিলেন। জমির মালিকানা ও উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল জমির মালিকদের হাতে, অথচ ফসল ফলানোর প্রধান শ্রম দিয়েছেন কৃষক। ইলা মিত্র এই অসমতার বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত হন। এখানে তাঁর নেতৃত্বের তাৎপর্য বুঝতে হলে শ্রেণি, জাতিসত্তা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক একসঙ্গে দেখতে হবে। সাঁওতাল কৃষকেরা শুধু অর্থনৈতিক শোষণের শিকার ছিলেন না, জাতিগত পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানও তাদের প্রান্তিক করে রেখেছিল। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তাই ফসলের ভাগের দাবি ছাড়িয়ে মর্যাদা, সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে পৌঁছেছিল।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের দিনে খুব বেশি জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু দৃশ্যমানতা আর ক্ষমতায়ন এক নয়। প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামকে নিজেদের জনপ্রিয়তা বা নৈতিক পরিচিতির পুঁজিতে পরিণত করে তাদের কণ্ঠস্বর আড়াল করা সংহতি নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা যাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলছি, তারা কি নিজেদের দাবি নিজেরা নির্ধারণ করতে পারছেন? সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের অংশগ্রহণ আছে? নাকি তাদের জীবন ও সংগ্রামের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা অন্যদের হাতেই থেকে যাচ্ছে? ইলা মিত্রের শিক্ষা হচ্ছে, সংহতি তখনই অর্থবহ, যখন তা নিপীড়িত মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি ও নেতৃত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখে।

ইলা মিত্রের জীবন নারী নেতৃত্বের ধারণাকেও নতুনভাবে দেখতে শেখায়। নেতৃত্বের মূল্য শুধু কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন নারীর উপস্থিতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় তিনি ক্ষমতার প্রচলিত সম্পর্ককে কতটা প্রশ্ন করছেন এবং অন্যদের ক্ষমতায়নের জন্য কী ভূমিকা রাখছেন, তা দিয়ে। ইলা মিত্রের রাজনৈতিক সক্রিয়তা শ্রেণি, জাতিসত্তা এবং লিঙ্গের প্রশ্নকে একই সংগ্রামের পরিসরে নিয়ে এসেছিল। তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, নারী নেতৃত্বের তাৎপর্য কেবল নারীর প্রতিনিধিত্বে নয়, বরং যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে ছিলেন, তাদের অধিকার ও নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করায়।

ইলা মিত্রের জীবন আমাদের দেখায়, ক্ষমতা যখন অধিকার আদায়ের সংগঠিত প্রচেষ্টাকে নির্যাতন দিয়ে দমন করতে চায়, তখন প্রতিরোধের ব্যাপারটি কোনো একজন ব্যক্তির সাহসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়।

১৩ অক্টোবর ছিল ইলা মিত্রের প্রয়াণ দিবস। তাঁকে স্মরণ করতে আজকের সমাজে ক্ষমতা ও অধিকার কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। আদিবাসী মানুষ, ভূমিহীন কৃষক, শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী এবং বৈষম্যের শিকার নারীদের জীবনে যেসব সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলে, সেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ কতটা? তাদের জমি, শ্রম, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে রাষ্ট্র ও সমাজের অবস্থান কী? কোনো জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলার দাবি যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, সেই জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেরা কথা বলতে এবং তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে কতটা সক্ষম হচ্ছেন।

ইলা মিত্রের উত্তরাধিকারকে ধারণ করার অর্থ হলো, প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামকে নিজেদের নেতৃত্বের প্রদর্শনীতে পরিণত না করা। তাদের দাবি, সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের অধিকারকে বাস্তবে স্বীকৃতি দেওয়া। যাদের অধিকার নিয়ে আমরা কথা বলি বা বলতে চাই, তাদের কণ্ঠস্বরের ওপর যেন আমাদের কণ্ঠস্বর প্রাধান্য না পায়। যাদের মুক্তির পক্ষে আমরা দাঁড়াই বা দাঁড়াতে চাই, তাদের হয়ে যেন আমরা মুক্তির সংজ্ঞা নির্ধারণ না করি। ইলা মিত্রকে স্মরণ করার দায় সেখানেই- ক্ষমতাহীন মানুষের জন্য জায়গা করে দেওয়া নয় শুধু, তাদের নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পাশে থাকা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: