বাবার ক্ষুধা লেগেছে

মতামত

কয়েকদিন আগে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইল বাজারে চুরির চেষ্টার অভিযোগে অনিক সরদার নামে এক ব্যক্তিকে স্থানীয়রা আটক করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে

2026-10-01T19:15:59+00:00
2026-10-01T19:15:59+00:00
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
বাবার ক্ষুধা লেগেছে
দীপু মাহমুদ
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
কয়েকদিন আগে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইল বাজারে চুরির চেষ্টার অভিযোগে অনিক সরদার নামে এক ব্যক্তিকে স্থানীয়রা আটক করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। ডিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সারারাত সেখানে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সকালে তার ছোট মেয়ে বাজারে এসে রুটি আর চা এনে খুঁটিতে বেঁধে রাখা বাবাকে খাইয়েছে। ঘটনার ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

অনিক সরদার অপরাধ করে থাকলে অবশ্যই সে আইনের আওতায় আসবে। তার ঘটনা পুলিশ তদন্ত করেছে। তবে এখানে জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠলেই তাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে সারারাত আটকে রাখা যায় কিনা!

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ বলছে, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার আছে। আইন ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ছাড়া কাউকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

অর্থাৎ কোনো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তার সঙ্গে যা খুশি করা যায় না। অভিযোগ তদন্তের বিষয়, অপরাধ প্রমাণের বিষয় আদালতের, আর শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আইনের নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের।

সেদিন অনিক সরদার যদি সত্যিই চুরি করতে গিয়ে থাকে, তাহলে সে হবে একজন অভিযুক্ত। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে সে অপরাধী নয়। আর অপরাধ প্রমাণিত হলেও শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কোনো বাজারের ভিড়ের হাতে নেই। পুলিশ আছে, আদালত আছে, আইন আছে। রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্বের অন্যতম কারণই তো এই- কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হবে, মানুষ নিজের হাতে বিচার করবে না।

‘গণপিটুনি’ আর ‘গণবিচার’-এর সংস্কৃতি আমাদের মৌলিক সমস্যা তৈরি করেছে। মানুষ অপরাধীকে ধরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মানুষ আদালত হয়ে যেতে পারে না। কেউ অপরাধ করতে গিয়ে ধরা পড়লে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করার ব্যবস্থা আছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারায় ব্যক্তিগতভাবে কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি থাকলেও এমন ব্যক্তিকে অযথা আটকে না রেখে বিলম্ব না করে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে।

সুতরাং ‘চোর ধরেছি’ বলে কাউকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা আইন প্রয়োগ নয়, বরং আইনের জায়গায় নিজের হাতে ক্ষমতা তুলে নেওয়া। এটা একজন মানুষের প্রকাশ্য অপমান। তাকে অসহায় অবস্থায় জনসমক্ষে অবজ্ঞাভরে প্রদর্শন করা এবং তার মানবিক মর্যাদাকে হেয় করা।

কাউকে আটক করা আর কাউকে শাস্তি দেওয়া একভাবে হতে পারে না। আইনসম্মত গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্য তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া, কিন্তু কাউকে প্রকাশ্যে অপমান করা বা জনসমক্ষে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা এর মধ্যে পড়ে না। ২০২৬ সালে সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধিতেও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পরিচয় প্রকাশ, এবং পরিবার বা মনোনীত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও হেফাজতের স্থান জানানোর মতো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া যুক্ত করা হয়েছে।

আমাদের প্রশ্ন তাই শুধু অনিক সরদারকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে। আমরা কি এমন সমাজ চাই, যেখানে আদালতের আগে বাজারে আদালত বসবে? যেখানে অভিযোগের আগে সাজা হয়ে যাবে? যেখানে কোনো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তার শরীরকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা যাবে?

উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে এই ঘটনাকেও ‘চোর ধরা পড়েছে’ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ থাকতে পারে না। কারণ এখানে একজন শিশু ছিল। খুঁটিতে বাঁধা অনিক সরদারের মেয়ে।

মেয়ে জানে না ‘অভিযুক্ত’ শব্দের অর্থ কী। সে জানে না চুরি হয়েছে কিনা, আইন কী বলে, পুলিশ কী করবে, আদালত কী করবে। সে শুধু জানত- খুঁটির সঙ্গে যে মানুষ বাঁধা আছে সে তার বাবা। আর বাবা সারারাত কিছু খায়নি। তাই সে রুটি নিয়ে এসেছিল।

বড়রা বাবার পরিচয়ের আগে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেখেছে। মেয়ে দেখেছে বাবাকে। বড়রা দেখেছে একজন সন্দেহভাজন চোর, মেয়ে দেখেছে একজন ক্ষুধার্ত মানুষ। আলাদা এই দেখা আমাদের থমকে দেয়। মেয়ে বাবার অপরাধের পক্ষে কোনো সাফাই দেয়নি। সে বলেনি, ‘আমার বাবা চুরি করেনি।’ সে আদালতে দাঁড়ায়নি। সে কোনো আইন ভাঙেনি। সে শুধু একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দিয়েছে। আর সেই মানুষ তার বাবা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে খুঁটিতে বাঁধা বাবার মুখে ছোট মেয়ের রুটি তুলে দেওয়া। এই দৃশ্যকে শুধু মেয়ে আর বাবার ভালোবাসার আবেগে আটকে ফেললে ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যাবে।

একজন শিশুর সামনে তার বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। অভিযোগ সত্য কিনা, সে বিষয়ে শিশুর কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক সমাজ তার সামনে যে দৃশ্য তৈরি করেছে, তার দায় প্রাপ্তবয়স্ক সমাজেরই।

আমরা প্রায়ই শিশুদের ভালো মানুষ হতে বলি। আইন মানতে বলি। অন্যকে সম্মান করতে বলি। অথচ তাদের চোখের সামনে কোনো মানুষকে অভিযোগের ভিত্তিতে অপমানিত হতে দিই। তখন শিশু কোন শিক্ষা পায়?

আরেকটি কথা- মানুষের মর্যাদা কি তার সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে? অনিক সরদার একজন দরিদ্র মানুষ বলেই কি তাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা সহজ হয়েছিল? সে যদি বিত্তশালী, প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি হতো, একই অভিযোগে তার ক্ষেত্রেও কি বাজারের মানুষ একই আচরণ করার সাহস পেত?

আমরা এই নির্দিষ্ট ঘটনার বিকল্প বাস্তবতা জানি না। তাই এমন দাবি করারও সুযোগ নেই যে ক্ষমতাবান হলে তার সঙ্গে অন্যরকম আচরণ হতো। তবে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আইনের সবচেয়ে মৌলিক দাবি হলো- মানুষের অধিকার তার পরিচয়, সম্পদ বা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না।

একজন দরিদ্র অভিযুক্তেরও একই অধিকার, যে অধিকার একজন ধনী অভিযুক্তের। একজন নিরক্ষর মানুষেরও একই মর্যাদা, যে মর্যাদা একজন শিক্ষিত মানুষের। একজন অচেনা মানুষেরও একই আইনি সুরক্ষা, যে সুরক্ষা একজন প্রভাবশালী মানুষের। এটাই আইনের শাসনের অর্থ।

চুরির অভিযোগকে আমরা হালকা করে দেখছি না। চুরি করা অপরাধ। আর তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার পাওয়ার অধিকার আছে। অপরাধীর শাস্তি পাওয়ারও আইনগত ব্যবস্থা আছে।

কিন্তু অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে যদি আমরা নিজেরাই আইন ভাঙি, তাহলে আমরা আদতে কোন ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছি?

একজন মানুষ চুরি করে থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। তদন্ত হতে পারে। আদালতে বিচার হতে পারে। দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। কিন্তু খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া নয়। বরং এটা আমাদের সমাজের বিপজ্জনক প্রবণতাকে সামনে আনে- আমরা কখনো অপরাধের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে এতটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই যে, সেই ক্ষোভের নামে মানুষের মৌলিক মর্যাদা লঙ্ঘনকেও বৈধ মনে করতে শুরু করেছি। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।

কারণ আইনের শাসন তখনই পরীক্ষা হয়, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি জনপ্রিয় নন, ক্ষমতাবান নন, অর্থবান নন, বরং দুর্বল। যে মানুষকে রক্ষা করার মতো সামাজিক ক্ষমতা নেই, তার অধিকার রক্ষা করতে পারাই রাষ্ট্র ও সমাজের আসল পরীক্ষা।

মেয়ে খুঁটিতে বাঁধা তার বাবার মুখে রুটি তুলে দিচ্ছে। এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আমাদের শুধু মেয়ের ভালোবাসা দেখা উচিত নয়। দেখা উচিত- একজন মানুষকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয়েছে। অভিযোগের বিচার হোক। অপরাধের বিচার হোক। কিন্তু মানুষের মর্যাদার বিচার যেন জনতার হাতে তুলে না দিই।

একজন মানুষ অপরাধী প্রমাণিত হতে পারে, কিন্তু কেউ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে মানুষ হিসেবে অপমান করার অধিকার কারও নেই।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: