সাফল্যের আড়ালে শূন্যতা: তৃপ্তকর জীবনের সন্ধান

মতামত

জীবনের একটি বড় সময় আমরা এক অদৃশ্য ইঁদুর দৌড়ে ব্যয় করি। আমাদের চোখে সাফল্যের মাপকাঠি হলো— বড় পদবি, ব্যাংক ব্যালেন্স,

2026-10-01T17:17:58+00:00
2026-10-01T17:17:58+00:00
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
সাফল্যের আড়ালে শূন্যতা: তৃপ্তকর জীবনের সন্ধান
-মো. সাদ্দাম হোসাইন
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১৭ পিএম 
প্রতীকী ছবি
জীবনের একটি বড় সময় আমরা এক অদৃশ্য ইঁদুর দৌড়ে ব্যয় করি। আমাদের চোখে সাফল্যের মাপকাঠি হলো— বড় পদবি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিলাসবহুল জীবনযাপন আর সামাজিক স্বীকৃতি। কিন্তু জীবনের নির্মম সত্য হলো, বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর পর অনেকেই হঠাৎ থমকে যান। চারপাশের কোলাহলের মাঝেও বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাহাকার বা শূন্যতা জেগে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগে— "এটাই কি সব?" বা "এরপর কী?"

সাফল্যের এই মরীচিকার পেছনে যে চরম শূন্যতা লুকিয়ে থাকে, তা বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের জীবনেও দৃশ্যমান। যেমন, জনপ্রিয় ভিডিও গেম 'মাইনক্রাফট'-এর নির্মাতা মার্কাস পারসন আড়াই বিলিয়ন ডলারে নিজের কোম্পানি মাইক্রোসফটের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পর এক টুইটে লিখেছিলেন, "আমি ইবিসায় বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করছি, বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি, যা চাইছি তাই করতে পারছি। কিন্তু জীবনে এর আগে কখনোই আমি এত তীব্র একাকীত্ব অনুভব করিনি।" অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী বিল গেটস এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বিলিয়ন ডলারের ব্যাংক ব্যালেন্স তাকে প্রকৃত সুখ দেয় না। তার মতে, নিজের সন্তানদের বেড়ে ওঠা দেখা এবং দাতব্য কাজের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের উপকারে আসতে পারাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। অর্থাৎ, বাহ্যিক অর্জন বা সাফল্য সাময়িক উল্লাস দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রশান্তি বা তৃপ্তি নিশ্চিত করতে পারে না।

সাফল্যের আড়ালে থাকা এই শূন্যতা পূরণের একমাত্র উপায় হলো 'ফুলফিলমেন্ট' বা প্রকৃত তৃপ্তি অর্জন। এটি কেবল অর্জনের ওপর নির্ভর করে না, বরং জীবনের উদ্দেশ্য এবং মূল্যবোধের সাথে আমাদের কাজগুলো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত সুখ তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: প্রথমত, পূর্ণতার অনুভূতি—যেখানে নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ এবং অর্থবহ মনে হয়। দ্বিতীয়ত, সামঞ্জস্য—জীবনের প্রতিটি কাজ যখন নিজের অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়। তৃতীয়ত, সার্থকতা—নিজের কাজ যখন অন্যের উপকারে আসে এবং সমাজের কাছে তার ইতিবাচক মূল্যায়ন থাকে।

এই যান্ত্রিক জীবনে কেবল সফল না হয়ে, কীভাবে আমরা এই প্রকৃত সুখ অর্জন করতে পারি? জীবনদর্শনের আলোকে কয়েকটি কার্যকর অভ্যাস আমাদের এই পথে সাহায্য করতে পারে:
গ্রোথ মাইন্ডসেট: সবসময় নতুন কিছু শেখার মানসিকতা বজায় রাখা জরুরি। স্থবিরতা মানুষকে বিষণ্ণ করে তোলে। শেখার আগ্রহ এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন থেকেই প্রকৃত সুখের সূচনা হয়। নতুন কিছু জানার আগ্রহ মানুষকে স্থির বা স্থবির অবস্থা থেকে বের করে আনে।

মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন: নিজের জীবনের মৌলিক মূল্যবোধ—যেমন সততা, সহানুভূতি ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা মেনে কাজ করা। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যখন নিজের বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়, তখন মানুষ ভেতর থেকে প্রশান্তি পায়। নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার চেয়ে বড় কোনো সুখ নেই।

অতীতকে ছেড়ে দেওয়া: অতীতের ভুল বা ব্যর্থতা নিয়ে আক্ষেপ করে সময় কাটালে বর্তমানের মূল্যবান সুযোগগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়। যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তা নিয়ে পড়ে না থেকে বর্তমানে মনোযোগ দেওয়াই তৃপ্তির অন্যতম চাবিকাঠি।

ভারসাম্য বজায় রাখা: পারফেকশনিস্ট বা খুঁতখুঁতে হওয়ার চেয়ে জীবনকে সহজভাবে গ্রহণ করতে হবে। জীবন সবসময় নিখুঁত হবে না, এখানে উত্থান-পতন থাকবেই—এই সত্য মেনে নিলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।

অন্যের কল্যাণে কাজ করা: নিজেকে ছাড়িয়ে যখন অন্যের সেবায় বা কল্যাণে অবদান রাখা যায়, তখনই জীবনের অর্থ ও সার্থকতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিল গেটস বা ওয়ারেন বাফেটের মতো মানুষেরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার পর জীবনের একটি পর্যায়ে এসে ঠিক এই কারণেই নিজেদের দাতব্য কাজে সঁপে দিয়েছেন।

সাফল্য মানে কেবল একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো, কিন্তু তৃপ্তি মানে সেই গন্তব্যের যাত্রাপথকে অর্থবহ করে তোলা। দিনশেষে, ব্যাংক হিসাব বা সামাজিক পদমর্যাদা আমাদের ভেতরের শূন্যতা ঘোচাতে পারে না। বরং, নিজের কাজ দিয়ে অন্যের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা এবং নিজের মূল্যবোধের প্রতি সৎ থাকাতেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত সুখ। আসুন, কেবল সফল হওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতায় না মেতে, একটি তৃপ্তিদায়ক ও অর্থবহ জীবনের সন্ধানে ব্রতী হই।

জনসংযোগ কর্মকর্তা
আল ফাতাহ গ্রুপ



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: