সুখ—ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর অর্থ মানুষের কাছে একেক রকম। কেউ অর্থ-সম্পদের মধ্যে সুখ খুঁজে পায়, কেউ ভালোবাসায়, কেউ স্বাধীনতায়, আবার কেউ খুব সাধারণ কিছু মুহূর্তের মধ্যে জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ খুঁজে নেয়। আমার কাছে সুখ এমন একটি অনুভূতি, যাকে কখনো কেনা যায় না, বেচা যায় না, এমনকি চোখে দেখাও যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।
অনেক টাকা-পয়সা থাকলেই মানুষ সুখী হয় না। অর্থ মানুষের অনেক প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু মনের শান্তি কিনে দিতে পারে না। আবার অল্পের মধ্যেও একজন মানুষ সুখী হতে পারে। কোনো দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করার পর তার মুখের হাসি দেখে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, সেটিও এক ধরনের সুখ। কখনো নিজের প্রিয় মানুষের সঙ্গে কয়েকটি সুন্দর মুহূর্ত, কখনো এক কাপ চা নিয়ে নিরিবিলি বসে থাকা, কখনো নিজের মতো করে কিছু করার স্বাধীনতা—এসব ছোট ছোট অনুভূতিও মানুষের জীবনে গভীর সুখ এনে দিতে পারে।
আমার কাছে মনে হয়, স্বাধীনচেতা মানুষগুলো অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি সুখী হতে পারে। কারণ তারা সব সময় অন্য মানুষ কী ভাবছে, কে কী বলছে—এসব নিয়ে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করে না। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিজের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত যদি শুধু অন্যের মতামতের ওপর নির্ভর করে নিতে হয়, তাহলে নিজের অস্তিত্বের স্বাধীনতাটুকু কোথায় থাকে?
কে কী ভাবল, কে কী বলল—এসব চিন্তা থেকে নিজেকে কিছুটা মুক্ত করে নিজের বিবেক ও মূল্যবোধ অনুযায়ী সামনে এগিয়ে চলার মধ্যেও সুখ আছে। তবে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, বিবেক ও অন্যের প্রতি সম্মানও থাকতে হয়।
সুখ কখনো দীর্ঘস্থায়ী নয়। এটি জীবনে বারবার আসে, আবার চলে যায়। কোনো একটি সুন্দর মুহূর্ত আমাদের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সেই মুহূর্ত চিরকাল থাকে না। অন্যদিকে দুঃখও জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুঃখ সব সময় আসে না, কিন্তু যখন আসে, তখন অনেক সময় মনের ওপর গভীর দাগ রেখে যায়। কিছু কষ্ট আমরা সময়ের সঙ্গে ভুলে যেতে পারি, আবার কিছু কষ্ট আমাদের স্মৃতির ভেতর থেকে যায়। সেই কারণেই হয়তো দুঃখের সময় সুখকে আমাদের কাছে খুব তুচ্ছ মনে হয়।
আমি মনে করি, স্বাধীনতার মধ্যেই মানুষের সবচেয়ে বড় সুখগুলোর একটি লুকিয়ে আছে। আপনি যতই অর্থের মালিক হন, যদি আপনার জীবন অদৃশ্য কোনো শিকলে বাঁধা থাকে, তাহলে সেই অর্থ আপনাকে পূর্ণ সুখ দিতে পারবে না। প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনকে ঘিরে যে বিপুল জনআগ্রহ ছিল, তার মধ্যেও আমরা দেখতে পাই—রাজকীয় জীবন, খ্যাতি ও সম্পদ থাকলেই ব্যক্তিগত সুখ নিশ্চিত হয় না। মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মানসিক শান্তি এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সুযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু নিজের মতো করে বাঁচাই সুখের একমাত্র পথ নয়। জীবনে অনেক কিছু আমাদের মেনে নিতে হয়। সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো হবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে জীবন কাটালে হতাশা বাড়ে। কিছু পরিস্থিতিকে মেনে নেওয়া, কিছু বিষয় ছেড়ে দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় তর্ক থেকে নিজেকে দূরে রাখা—এসবের মধ্যেও এক ধরনের শান্তি আছে।
মানুষ যত বেশি সংবেদনশীল হয়, তত বেশি সে অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে। আর অন্যকে বোঝার ক্ষমতা অনেক সময় নিজের মধ্যেও এক ধরনের প্রশান্তি তৈরি করে। সব কথার উত্তর দিতে হয় না, সব তর্কে জিততে হয় না, সব সম্পর্ক ধরে রাখতেও হয় না। কখন কোথায় থেমে যেতে হবে, কখন কিছু কথা না বলাই ভালো—এটিও জীবনের একটি শিক্ষা।
আমার মনে হয়, প্রত্যেক সুখের পেছনেই কোনো না কোনো বিসর্জন থাকে। কখনো নিজের অহংকার বিসর্জন দিতে হয়, কখনো অপ্রয়োজনীয় প্রত্যাশা, কখনো কোনো সম্পর্ক, আবার কখনো নিজের কিছু ইচ্ছা। সবকিছু আঁকড়ে ধরে রেখে সুখী হওয়া যায় না। কিছু জিনিস ছেড়ে দিতে হয়, কিছু বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয়।
জীবন তাই শুধু সুখের গল্প নয়। এখানে সুখ আছে, দুঃখ আছে, প্রাপ্তি আছে, অপূর্ণতা আছে, স্বাধীনতা আছে, আবার সীমাবদ্ধতাও আছে। আর এই সবকিছুর মাঝেই মানুষ নিজের মতো করে সুখের অর্থ খুঁজে নেয়।
আমার কাছে সুখ মানে শুধু হাসি নয়।
সুখ মানে মনের শান্তি।
সুখ মানে নিজের কাছে সৎ থাকা।
সুখ মানে অন্যের ভালো করতে পারার তৃপ্তি।
সুখ মানে নিজের জীবনকে নিজের বিবেক অনুযায়ী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।
আর কখনো কখনো—সুখ মানে কিছু হারিয়েও শান্ত থাকতে শেখা।
তাই মনে হয়, সুখকে পাওয়ার আগে আমাদের বিসর্জন দিতে শিখতে হবে, মেনে নিতে শিখতে হবে এবং সবচেয়ে বেশি—নিজেকে বুঝতে শিখতে হবে।