এই সময়ের তুমুল ডাকসাইটে একজন লেখকের সান্নিধ্য পেয়েছি এ জীবনে। তখন আমার তুখোড় তারুণ্য। লেখক হওয়ার ভাঙচুর আকাঙ্ক্ষা। লিখে সেই লেখা পড়তে দিলাম ডাকসাইটে লেখককে। তিনি আমার লেখা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখলেন। বললাম, ঘটনা কী!
তিনি বললেন, জঘন্য টাইপের পচা লেখা। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। নোংরার গন্ধে যাতে মশা-মাছি ভিড় না করে তাই ঢেকে রেখেছি।
বুঝলাম ব্যর্থ হয়ে গেছি। লেখক হিসেবে আমি পুরোপুরি ব্যর্থ। তবে থামলাম না। চোখ মন মাথা খুলে দুনিয়া দেখতে থাকলাম। আরও পড়লাম। দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়ে আবার লেখা শুরু করলাম।
গল্প লিখে পত্রিকায় পাঠাই। আমার লেখা গল্প ছাপা হয় না। কেন ছাপা হয় না তা জানতে পারি না। কোনো পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। বই পড়ে বুঝতে চেষ্টা করি জীবনের ঘটনা কীভাবে গল্প হয়ে ওঠে। আরও গল্প লিখি। পত্রিকায় পাঠাই। আমার লেখা গল্প ছাপা হয়ে আসে না।
একবার একজন সাহিত্য সম্পাদকের সন্ধান পেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার লেখা গল্প কেন গল্প হয় না?
তিনি বললেন, আপনার ভাষা এত আনস্মার্ট, এত গেঁয়ো। পড়া যায় না।
বুঝলাম ব্যর্থ হয়ে গেছি। লেখক হিসেবে আমি পুরোপুরি ব্যর্থ। তবু থামলাম না। আরও মনোসংযোগ করলাম। একাগ্রচিত্তে লিখে যেতে থাকলাম।
আমার লেখা গল্প উপন্যাস পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকল। জৈষ্ঠ্যমাসের পাকা আমের মতো ঝুপঝাপ করে আমার কাছে সাহিত্য পুরস্কার আসতে থাকল। আমি লেখায় আধুনিক স্মার্ট ভাষার সন্ধান করলাম। গল্পকে আরও আধুনিক করে তুলতে চাইলাম। তোলপাড় করে জনপ্রিয় হয়ে গেল বই। একই বছরে মুদ্রণ এল একাধিক।
সেই বইয়ের লেখা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একজন পাঠক বললেন, আপনি কেন এই রাবিশ লেখা লিখলেন! এই লেখা না লিখলে সাহিত্যের কোনো ক্ষতি হতো না। আপনি আমার সময় নষ্ট করিয়েছেন। প্রকাশ্যে আপনার শাস্তি হওয়া দরকার। আমাদের দুর্ভাগ্য যে শহীদুল জহিরের পরে বাংলাদেশে আর কোনো লেখক জন্মায়নি। আপনি লেখালেখি বাদ দিয়ে দেন।
এখানে এসে মনে হতে পারে লেখক হিসেবে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে গেছি। আমি জানি ব্যর্থ আমি হয়ে যাইনি। আর তাই লেখালেখি বাদ দিলাম না। কারণ আমি উচ্চাঙ্গ বা মার্গীয় সাহিত্যের লেখক নই। জনপ্রিয় ধারার লেখক। সিরিয়াস লেখক। আমি চাই লেখা সহজে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে যাক। যে লেখার কাহিনি হবে টানটান উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আর কৌতূহলে ভরা। তাই আমি রহস্য, রোমাঞ্চ, থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন, প্রেমের গল্প উপন্যাস লিখি।
আজ বিশ্ব ব্যর্থতা দিবস। মানুষ হিসেবে আমরা কেউ ব্যর্থ নই। নিজেকে কোথায় দাঁড় করিয়ে কোন পার্সপেক্টিভে দেখছি সেটা বিবেচনার বিষয়। আমার সীমানা ছুঁতে না পারা মানুষের মুখে ব্যর্থতার কুকথা বিবেচ্য নয়।