গেন্ডারিয়ার সেই রাতে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছিল, নাকি একটা সিনেমার শুটিং, ভিডিও দেখে অনেকেরই সেটা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে। তবে একটা বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই। প্রযোজক, পরিচালক, নায়ক আর পেজের অ্যাডমিন, সব ভূমিকায় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের কাজ ছিল নিখুঁত। কাস্টিংয়ে শুধু একটা ছোট্ট ভুল হয়েছিল, পিস্তলটাকে সহশিল্পীর মর্যাদা দেওয়া হয়নি, তাই তাকে ঝাপসা করে রাখা হলো। ছবি মুক্তির পরদিনই সেন্সর বোর্ড বসে গেল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। আর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত নিজেই মুক্তি পেলেন, মন্ত্রিত্ব থেকে।
তাঁর মন্ত্রণালয়ের নাম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক। সম্ভবত নামের ঐ যুদ্ধ শব্দটাকে তিনি অতি উদার অর্থে ধরে নিয়েছিলেন। যুদ্ধ যেখানে যেখানে পাওয়া যায়, সেখানেই নেমে পড়া। এই যুক্তিতে কাল দেখা যাবে শিক্ষামন্ত্রী নকল ধরতে ছাত্রদের পকেটে হাত ঢোকাচ্ছেন, আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী মশা মারতে ব্যাট হাতে ঘুরছেন। দায়িত্বের সীমা বলে যে একটা জিনিস আছে, তা ভুলে যাওয়ার জন্য ক্ষমতার চেয়ারের মতো এমন কার্যকর স্মৃতিনাশক আর হয় না।
এর আগে স্মৃতিসৌধে তিন বাহিনীর প্রধানের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর স্যালুট দেওয়া নিয়েও ফেসবুকে হাসাহাসি হয়েছিল। জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন, হাত তাঁর, ইচ্ছাও তাঁর। হাত যে একান্ত তাঁর নিজের, তা নিয়ে কারও কোন আপত্তি নেই। আপত্তি যত, হাতে কী থাকবে তা নিয়ে।
মজার ব্যাপার হলো, পদত্যাগের দাবি তোলা ইশরাক হোসেনের রাজনীতির নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ। ২০২৫ সালে দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ চেয়ে তিনিই রাজপথ গরম করেছিলেন। এবার জীবনে প্রথমবার তিনি নিজেই মেনুতে উঠলেন। রেস্তোরাঁর খাবারের রিভিউ লেখা সহজ, নিজে পরিবেশিত হলে বোঝা যায় প্লেটটা কত গরম।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় লাভটা করেছে মাদকের কারবারিরা। এতদিন মানুষের প্রশ্ন ছিল, মাদক আসে কোথা থেকে। এখন প্রশ্ন হয়ে গেছে, প্রতিমন্ত্রীর হাতে পিস্তল কেন। বিতর্ক চলছে, বিবৃতি আসছে, ভিডিও জুম হচ্ছে। কিন্তু মাদক কোথা থেকে আসে, সেই প্রশ্নটা চুপচাপ কোণায় গিয়ে বসেছে, কেউ ডাকছে না। যে অভিযানের শিরোনামে থাকার কথা ছিল মাদক, সেখানে শিরোনাম হলেন প্রতিমন্ত্রী। কারবারিরা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দেখছে, তাদের নিয়ে কেউ কথাই বলছে না। এমন বিনা পয়সার পিআর ক্যাম্পেইন কোনো এজেন্সিও করে দিতে পারত না।
এদিকে শোনা যাচ্ছে, মন্ত্রিত্ব গেলেও ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হওয়ার স্বপ্ন যায়নি। এ শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহুদিনের। একবার তাঁর সমর্থকদের আন্দোলনে নগর ভবনের ফটকে তালা পড়েছিল, নাগরিক সেবা থমকে গিয়েছিল। এবার তিনি চান সেই ঘরের চাবিটাই। বাড়ির গেটে নিজেই তালা মেরে এখন বলছেন, ভেতরে ঢুকতে দিন, আমি আপনাদের সেবা করব।
কল্পনা করুন তাঁর মেয়রের দিনলিপি। ডেঙ্গু মৌসুমে এডিসের আস্তানা খুঁজতে মেয়র নিজেই অভিযানে নামবেন, লাইভে। মশা ধরা না পড়ুক, ফ্রেমে মেয়র ঠিকই ধরা পড়বেন। রাস্তা জলে ডুবলে রাতে পেজে লেখা হবে, জলাবদ্ধতার খবর গুজব। সকালে নৌকা নামবে, আর দুপুরে জানানো হবে, কারিগরি ত্রুটির দায়ে একজন সহকারী প্রকৌশলী পদত্যাগ করছেন। ভাগাড়ে যাবেন সবুজ হেলমেট পরে, আর ময়লার গাড়ির চালককে স্যালুট দেবেন, কারণ হাত তাঁর, ইচ্ছাও তাঁর। ঢাকার সমস্যা মিটুক বা না মিটুক, শহরের প্রতিটি ড্রেন, ভাগাড় আর মশা জীবনে প্রথমবার ভালো আলোয় তোলা ছবি পাবে।
এবার করণীয় একটাই। সরকার যেভাবে জনগণকে একটার পর একটা কার্ড ধরিয়ে দিচ্ছে, ঠিক সেভাবে শপথের দিন প্রতিটি মন্ত্রীর হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দেওয়া হোক। তাতে লেখা থাকবে তিনটা নিয়ম। এক, পিস্তল হাতে থাকলে ক্যামেরা অন করবেন না। দুই, ক্যামেরা অন থাকলে পিস্তল হাতে নেবেন না। তিন, দুটোই যদি একসঙ্গে ঘটে যায়, তাহলে ভিডিওটা কাউকে না দেখিয়ে ফোনের সেই গোপন ফোল্ডারে রেখে দিন, যেখানে আমরা সবাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্তগুলো লুকিয়ে রাখি। ওই ফোল্ডারে ভুল ভালো থাকে, বাইরে বেরোলেই বিপদ।