নিয়ন্ত্রিত গতি, নিশ্চিন্ত ভ্রমণ

মতামত

২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর সকালে ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধলেশ্বরী টোল প্লাজায় টোল দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা একটি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলকে

2026-10-22T17:10:32+00:00
2026-10-22T17:10:32+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
নিয়ন্ত্রিত গতি, নিশ্চিন্ত ভ্রমণ
—ইস্তিয়াক ইমন
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর সকালে ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধলেশ্বরী টোল প্লাজায় টোল দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা একটি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলকে পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগতির বাস ধাক্কা দেয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই পরিবারের পাঁচজন প্রাণ হারান, যাঁদের মধ্যে একটি কোলের শিশুও ছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রশ্ন তোলে—চালকের ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটিকে দায়ী করেই কি রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায় শেষ হয়ে যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করতে হবে। এর মূল দর্শন হলো, মানুষ ভুল করবেই, কিন্তু সেই ভুলের কারণে যেন কারও প্রাণহানি না ঘটে। প্রচলিত ব্যবস্থায় চালক বা পথচারীকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হলেও আধুনিক এই পদ্ধতিতে সড়ক, যানবাহন, আইন, প্রকৌশল, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার সম্মিলিত দায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়।

১৯৯৭ সালে সুইডেন ‘ভিশন জিরো’ নীতি গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য সড়কে প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাত শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা। এই দর্শনের পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ হলো নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ মানুষ, নিরাপদ গতি এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী কার্যকর চিকিৎসা। এর মধ্যে গতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষের শরীর নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি আঘাত সহ্য করতে পারে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যানবাহনের গড় গতি মাত্র ১ শতাংশ বাড়লে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার গতির পরিবর্তে ৬৫ কিলোমিটার গতিতে চলা গাড়ির ধাক্কায় পথচারীর মৃত্যুঝুঁকি প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি। বিপরীতে, ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে সংঘর্ষ হলে পথচারীর মৃত্যুঝুঁকি ১০ শতাংশের নিচে থাকতে পারে। বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। বিশেষ করে ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। তাই গতি নিয়ন্ত্রণ কেবল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জীবন রক্ষার কার্যকর উপায়।

বাংলাদেশে একই সড়কে পথচারী, রিকশা, সাইকেল, মোটরসাইকেল, বাস ও ট্রাক চলাচল করায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বাস-ট্রাকের মধ্যে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা, চালকদের বেপরোয়া গতি, অনিরাপদ ওভারটেকিং, ক্লান্তি এবং মোটরসাইকেল চালক ও যাত্রীদের হেলমেট ব্যবহারে অবহেলা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। দেশের মোট মোটরচালিত যানবাহনের প্রায় ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ এই যানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ২ হাজার ৬৭১ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ। সংস্থাটির হিসাবে, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বিআরটিএর হিসাবে ২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৯০ জন এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ৯ হাজার ১১১ জন। এই পরিসংখ্যানের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতদের তথ্য সংগ্রহ, নিবন্ধন এবং বিশ্লেষণের জন্য নির্ভরযোগ্য জাতীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

২০১৮ সালে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের রেষারেষিতে দুই কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যু দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সড়কে প্রাণহানি বন্ধ হয়নি। ধলেশ্বরী টোল প্লাজার ঘটনাও প্রমাণ করে, শুধু আইন বা সচেতনতা নয়, নিরাপদ অবকাঠামো ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা দেখায়, পরিকল্পিত সড়ক নকশা এবং গতিসীমা কার্যকরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক পরিবহন ফোরামের সুপারিশ অনুযায়ী, আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার, সাধারণ শহুরে সড়কে ৫০ কিলোমিটার এবং বিভাজকহীন গ্রামীণ সড়কে ৭০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা যেতে পারে। বিপরীতমুখী যান চলাচল আলাদা করা, ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ের পরিবর্তে উপযুক্ত রাউন্ডঅ্যাবাউট নির্মাণ এবং স্পিড ক্যামেরা স্থাপনও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক।

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পাঁচটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও আবাসিক এলাকায় ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণ ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মহাসড়কে স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল সেন্সর এবং স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি দূর করে নিরাপদ বিভাজক, পথচারী পারাপার এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য উপযুক্ত লেন নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ন্যায্য বেতন ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ক্লান্তি ও অতিরিক্ত আয়ের চাপ থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি কমে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক মান অনুসারে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের তথ্য সংগ্রহের সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেস গড়ে তুলতে হবে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার বৈশ্বিক অঙ্গীকার রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আধুনিক অবকাঠামো এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহন খাতের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপের ঊর্ধ্বে উঠে জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পেছনে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং অপেক্ষমাণ প্রিয়জনের গল্প রয়েছে। গতি নিয়ন্ত্রণ মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করে না; বরং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা বাড়ায়। সড়ককে মানুষের ভুলের প্রতি ক্ষমাশীল করে তুলতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ নকশা, কার্যকর প্রযুক্তি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রিত গতিই প্রাণহানি কমিয়ে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর পথ।

লেখক: ইস্তিয়াক ইমন

কর্মী, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: