দেশ আলাদা, হৃদয় এক—বিজয়া দশমীতে হিলি সীমান্তে দুই বাংলার টান

দিনাজপুর সংবাদদাতা

সারাদেশ

শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে দেখা গেল দুই বাংলার মানুষের আবেগঘন উপস্থিতি। কাঁটাতারের বেড়ার এপারে বাংলাদেশ,

2026-10-21T15:25:52+00:00
2026-10-21T15:25:52+00:00
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
দেশ আলাদা, হৃদয় এক—বিজয়া দশমীতে হিলি সীমান্তে দুই বাংলার টান
দিনাজপুর সংবাদদাতা
বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে দেখা গেল দুই বাংলার মানুষের আবেগঘন উপস্থিতি। কাঁটাতারের বেড়ার এপারে বাংলাদেশ, ওপারে ভারত—মাঝখানে দূরত্বের দেয়াল থাকলেও স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা আর টান যেন সেই বিভাজনকে হার মানিয়েছে। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিনে সীমান্তের দুই পাশে জড়ো হন অনেকে। কারও উদ্দেশ্য প্রতিমা দেখা, আবার কেউ এসেছেন ওপারে থাকা আত্মীয়স্বজনকে একনজর দেখার আশায়।

বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকেই হিলি সীমান্তের চেকপোস্ট ও শূন্যরেখা-সংলগ্ন এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষকে সীমান্ত এলাকায় ভিড় করতে দেখা যায়। ভারতের দিক থেকেও অনেকে সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান নেন। উৎসবের আমেজের সঙ্গে মিশে ছিল দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া প্রিয়জনদের কাছে পাওয়ার আকুলতা।

কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে কেউ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, কেউ মুঠোফোনে কথা বলে স্বজনদের খোঁজখবর নেন। আবার কেউ দূর থেকে প্রিয় মুখটি দেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কয়েক হাত দূরে থেকেও কাছে যেতে না পারার আক্ষেপ তাঁদের মনে কষ্ট জাগায়। তবু একঝলক দেখা পাওয়ার আনন্দে অনেকের মুখে ফুটে ওঠে হাসি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশভাগের পর বাংলাদেশ ও ভারতের ভূখণ্ড আলাদা হলেও হিলি সীমান্তের দুই পাশে বহু পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক এখনো অটুট। দুই দেশে বসবাসের কারণে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ কঠিন হয়ে পড়েছে অনেকের জন্য। ভিসা, পাসপোর্ট ও সীমান্তসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ইচ্ছা থাকলেও সহজে স্বজনদের কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই দুর্গাপূজার মতো উৎসবের দিনে সীমান্তে এসে প্রিয়জনকে দেখার চেষ্টা করেন কেউ কেউ।

সীমান্তে আসা অভি বসাক বলেন, ওপারে আমাদের আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। অনেক দিন তাঁদের সঙ্গে দেখা হয় না। পূজার এই দিনে একনজর দেখার আশায় এখানে এসেছি। কাছে গিয়ে কথা বলতে না পারলেও দূর থেকে দেখতে পারলে মনটা ভালো হয়ে যায়। দুই দেশে থাকলেও আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধন একই রকম।

তিনি বলেন, উৎসবের দিনে পরিবারের সবাইকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সীমান্তের নিয়মের কারণে তা সব সময় সম্ভব হয় না। তাই দূর থেকে স্বজনদের দেখতে পাওয়াও তাঁদের কাছে অনেক আনন্দের।

আরেক দর্শনার্থী মৌমিতা সেন বলেন, দুর্গাপূজা আনন্দ ও মিলনের উৎসব। এই সময়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা আরও বেড়ে যায়। ওপারে থাকা পরিচিত ও আত্মীয়দের দেখতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সীমান্তে এসেছেন তিনি।

মৌমিতা বলেন, কাঁটাতারের কারণে কাছে যেতে না পারার কষ্ট আছে। তারপরও দূর থেকে তাঁদের দেখতে পেলে মনে হয়, মনের আশা কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে। দুই পাশে দুটি দেশ হলেও মানুষের আবেগ তো আলাদা নয়।

সীমান্তে আসা দর্শনার্থীদের মতে, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করারও উপলক্ষ। কিন্তু সীমান্তের দুই পাশে থাকা অনেক পরিবারের কাছে সেই আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর মতো আবেগঘন দিনে কাছাকাছি থেকেও স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে না পারার বেদনা আরও তীব্র হয়।

দর্শনার্থীদের কেউ কেউ মনে করেন, দুই দেশের আইন ও সীমান্তের নিরাপত্তাব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে বিশেষ উৎসবে স্বজনদের মধ্যে সৌজন্য বিনিময়ের সুযোগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তাঁদের প্রত্যাশা, এতে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা পরিবারগুলোর সদস্যদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও প্রচলিত বিধিনিষেধ মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।

বিজয়া দশমী আনন্দের পাশাপাশি বিদায়েরও দিন। প্রতিমা বিসর্জন ও বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। আর হিলি সীমান্তে এই বিদায়ের দিনে দুই বাংলার মানুষের উপস্থিতি হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, অপেক্ষা ও বিচ্ছেদের এক আবেগঘন প্রতিচ্ছবি।

কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশের ভূখণ্ডকে আলাদা করে রাখলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধন যে মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত, হিলি সীমান্তের এই দৃশ্য যেন তারই প্রমাণ। বিজয়া দশমীর দিনে তাই এখানে শুধু উৎসবের বিদায় নয়, ফুটে উঠেছে সীমান্তের দুই পাশে থাকা মানুষের স্বজনপ্রীতি ও চিরন্তন মানবিক টানও।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: