অমর একুশে বইমেলা বাঙালির ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে ফেব্রুয়ারিজুড়ে আয়োজিত এ মেলার সময়সূচি নিয়ে এবারও তৈরি হয়েছে আলোচনা। বাংলা একাডেমির ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের অমর একুশে বইমেলা শুরু হবে ৭ জানুয়ারি, চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ সিদ্ধান্তের পর বইমেলার ঐতিহ্য ও একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২০২৭ সালের বইমেলার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম জানান, প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা করেই মেলার সময়সূচি ঠিক করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে বাপুসের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেছেন, তাঁরা বইমেলার সঙ্গে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক যোগসূত্র বজায় রাখতে চান। তাঁর মতে, অমর একুশে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার আয়োজন নয়; এটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ।
রেজাউল করিম বাদশার দাবি, বাংলা একাডেমির বিজ্ঞপ্তিতে মেলা ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা বলা হলেও সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা চালানোর বিষয়ে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, মেলা এক মাসের বেশি চললেও আপত্তি নেই, তবে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে এর সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।
বইমেলার সময়সূচি নির্ধারণে প্রকাশকদের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনার ওপরও জোর দেন বাপুস সভাপতি। তাঁর ভাষ্য, মেলায় অংশ নিতে প্রকাশকদের স্টল, কর্মী, পরিবহন ও বই প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে তাঁদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। রমজানের কারণে এবারও বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সৃজনশীল প্রকাশনীর মালিক জানান, রোজার সময় বইমেলায় ক্রেতা-সমাগম কম হতে পারে। এতে প্রকাশকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ কারণেই মেলা এগিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলার সময়সূচি নিয়েও একাধিকবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলা একাডেমি ঘোষণা করেছিল, ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মেলা অনুষ্ঠিত হবে।
তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখক ও প্রকাশকদের একাংশ আপত্তি জানান। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ডিসেম্বরের নির্ধারিত সময়সূচি স্থগিত করে বাংলা একাডেমি।
পরবর্তী সময়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ২০২৬ সালের বইমেলা ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলবে। তবে শেষ পর্যন্ত মেলা শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং শেষ হয় ১৫ মার্চ।
নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি ও রমজানের মধ্যে মেলা আয়োজন নিয়ে প্রকাশকদের একাংশের উদ্বেগ ছিল। তাঁদের আশঙ্কা, এ সময়ে ক্রেতা-সমাগম কম হলে বিক্রি কমে যাবে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
প্রকাশকদের কাছে বইমেলা বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিক্রির উপলক্ষ। মেলায় অংশগ্রহণের জন্য আগেভাগে বই প্রকাশ, স্টল প্রস্তুত ও বিপণন পরিকল্পনা করতে হয়। সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে এসব প্রস্তুতি ব্যাহত হয়। অন্যদিকে, মেলার সময় ক্রেতা কম থাকলে বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে বইমেলার গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যিক বিবেচনায় সীমাবদ্ধ নয়। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও একুশের চেতনা ধারণ করে গড়ে ওঠা এ আয়োজনের সঙ্গে ফেব্রুয়ারির সম্পর্ককে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের অনেকে।
এ পরিস্থিতিতে বইমেলার সময়সূচি নির্ধারণে একদিকে প্রকাশকদের আর্থিক স্বার্থ, অন্যদিকে অমর একুশে বইমেলার ঐতিহাসিক পরিচয়—দুই বিষয়ই গুরুত্ব পাওয়ার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন সময়সূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে বইমেলার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি প্রকাশকদের আর্থিক ঝুঁকিও কমানো যায়।