শৈশবের কৌতূহল থেকে প্রযুক্তির প্রতি ভালোবাসা, আর সেই ভালোবাসা থেকেই একের পর এক উদ্ভাবন। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর তরুণ প্রকৌশলী মো. সামিউল ইসলাম ইতোমধ্যে ১৫০টিরও বেশি প্রকৌশল প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন। রোবোটিকস, স্মার্ট কৃষি, অটোমেশন ও মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তির ব্যবহার—এসব ক্ষেত্রেই তাঁর আগ্রহ। তাঁর লক্ষ্য, দেশীয় উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবন আরও সহজ ও নিরাপদ করা।
সামিউল পলাশবাড়ী উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের পূর্ব গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা শফিকুল ইসলাম ও মা লাইজু বেগম। ছোটবেলা থেকেই বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করার প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। লাইট, ফ্যান কিংবা মসজিদের মাইকের ত্রুটি সারাতে সারাতেই প্রযুক্তির প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় তাঁর। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় তৈরি করেন একটি বৈদ্যুতিক নৌকা। পরে স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় টানা দুই বছর প্রথম স্থান অর্জন করে নিজের উদ্ভাবনী দক্ষতার পরিচয় দেন।
ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনার সময় তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। এ সময় তিনি সেবা ও পর্যবেক্ষণ রোবট, স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূরনিয়ন্ত্রিত সেচব্যবস্থা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সহায়ক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন।
তাঁর তৈরি একটি রোবট খাবার ও নোটিশ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ও আগুন শনাক্ত করে সতর্কসংকেত দিতে পারে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজ সহজ করা এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ টিউশন ফি মওকুফের সুযোগ পেয়েছেন সামিউল। ২০২৫ সালে IEEE BECITHCON প্রকল্প প্রদর্শনীতে তৃতীয় স্থান এবং INCON-2025-এর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি শাখায় দ্বিতীয় রানার-আপ হন। আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের একটি প্রকল্প প্রতিযোগিতায়ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনের স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
বর্তমানে সামিউল খুলনা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (টিটিসি) ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি তরুণদের কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘Engineering BD’। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
সামিউলের মতে, বাংলাদেশের তরুণদের উদ্ভাবনী প্রতিভা রয়েছে; তবে সেই প্রতিভাকে বাস্তব কাজে রূপ দিতে প্রয়োজন আধুনিক গবেষণাগার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন এবং গবেষণার সুযোগ। তাঁর বিশ্বাস, বিজ্ঞান মেলার প্রকল্পের মধ্যেই উদ্ভাবনকে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষি, শিক্ষা, শিল্প ও জনজীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
আমলাগাছী ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাজেদ সরকার বলেন, স্কুলজীবন থেকেই সামিউলের ব্যবহারিক কাজের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। অন্যদিকে, খুলনা টিটিসির অধ্যক্ষ মো. জিয়াউর রহমান জানান, সামিউলের দক্ষতা বিকাশে রোবট তৈরির জন্য অর্থায়ন ও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
শৈশবে একটি বৈদ্যুতিক নৌকা তৈরির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সামিউলের প্রযুক্তিযাত্রা এখন ১৫০টিরও বেশি প্রকল্পে বিস্তৃত। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থায়ন ও গবেষণার সুযোগ পেলে দেশীয় উদ্ভাবন দেশের মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।