ডাকঘরে এখন প্রেমপত্র আসে না, প্রতিদিন আসছে তালাকনামা

নিজস্ব প্রতিবেদক

সারাদেশ

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে ভালোবাসার প্রকাশ, যোগাযোগের মাধ্যম এবং সমাজজীবনের স্বাভাবিক দৃশ্যপট। একসময় প্রিয়জনের একখানি চিঠি বা দূর থেকে পাঠানো

2026-10-10T19:29:34+00:00
2026-10-10T19:33:19+00:00
  শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
চিঠির যুগে বিচ্ছেদের ছায়া
ডাকঘরে এখন প্রেমপত্র আসে না, প্রতিদিন আসছে তালাকনামা
নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২৯ পিএম  আপডেট: ১০.১০.২০২৬ ৭:৩৩ পিএম
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলেছে সমাজ: প্রেমপত্র এখন অতীত, ডাকপিয়নের ব্যাগে কেবলই তালাকনামা ও আইনি চিঠি
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে ভালোবাসার প্রকাশ, যোগাযোগের মাধ্যম এবং সমাজজীবনের স্বাভাবিক দৃশ্যপট। একসময় প্রিয়জনের একখানি চিঠি বা দূর থেকে পাঠানো একটি টেলিগ্রামের আশায় ব্যাকুল হয়ে প্রহর গুনতেন মানুষ। রঙিন চিঠির খাম খোলার আনন্দ কিংবা ডাকপিয়নের ঘণ্টার শব্দে যে আবেগ মিশে থাকত, তা এখন শুধুই ইতিহাস। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডাকঘরগুলোর বর্তমান চিত্র যেন সেই অতীত ঐতিহ্যের বিলুপ্তি এবং বদলে যাওয়া এক সামাজিক বাস্তবতার কঙ্কালসার রূপ তুলে ধরছে।

উপজেলার গ্রামীণ এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, এখন আর আগের মতো ডাকঘরগুলোতে মানুষের আনাগোনা বা পিওন-রানারদের ব্যস্ততা নেই। বেশিরভাগ শাখা ডাকঘরই ঝোপঝাড় আর পরগাছায় আবৃত হয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সরেজমিনে মাওহা ইউনিয়নের ভূটিয়ারকোনা শাখা ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট যাতায়াতের পথ নেই, চারপাশ জঙ্গলে ভরা এবং দরজার সামনে আবর্জনার স্তূপ। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পোস্টমাস্টারের দেখা মেলেনি। অচিন্তপুর, মইলাকান্দা, রামগোপালপুর ও বোকাইনগর ইউনিয়নের শাখা ডাকঘরগুলোর অবস্থাও একই রকম করুণ।

সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয় হলো, এসব ডাকঘরের আধুনিক সেবাব্যবস্থা যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে, তেমনি পাল্টে গেছে চিঠিপত্রের ধরনও। শাখা পোস্টমাস্টারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দু-তিন বছরে কোনো তরুণ-তরুণীর প্রেমপত্র কিংবা ব্যক্তিগত কুশলাদি বিনিময়ের কোনো চিঠি ডাকঘরে আসেনি। সব ডিজিটাল হয়ে গেছে মুঠোফোনের ভিড়ে। তবে প্রেমপত্র উধাও হলেও উল্টোচিত্র দেখা গেছে বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে। ডাকঘরগুলোতে এখন প্রতিদিন আসছে বিচ্ছেদের বার্তা। গৌরীপুর প্রধান ডাকঘরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে কেবল তাদের উপজেলাতেই বিভিন্ন শাখা মিলিয়ে ১৬০ থেকে ১৮০টি তালাকনামা বা আইনি নোটিশ আসে, যা বছরে দুই হাজারেরও বেশি। প্রেম ও অনুরাগের জায়গা দখল করে নিয়েছে সরকারি-বেসরকারি নিয়োগপত্র, আদালতের সমন, এনজিওর নোটিশ এবং বিচ্ছেদের খবর।

ডিজিটাল বাংলাদেশে ডাকসেবাকে আধুনিকায়ন করতে এসব পোস্ট অফিসে সৌরবিদ্যুৎ, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার সরবরাহ করা হলেও পরিচর্যা ও কারিগরি সহায়তার অভাবে অধিকাংশ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে বা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, তীব্র আর্থিক সংকটের কথা জানিয়েছেন প্রান্তিক এই ডাকসেবকরা। পাছার ডাকঘরের পোস্টমাস্টার জানান, ১৯৯১ সাল থেকে কাজ করলেও বর্তমানে তাঁদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত নামমাত্র—পোস্টমাস্টার পান ৪,৪৬০ টাকা, পিয়ন পান ৪,৩৫৪ টাকা এবং রানার পান ৪,১৭৭ টাকা। গৌরীপুর প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আমিনুল ইসলাম জানান, পুরো উপজেলা ডাকঘরের জন্য মাসে মাত্র ৮০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা দিয়ে সামান্য দাপ্তরিক সরঞ্জাম কেনাও সম্ভব নয়। চরম বাজেট স্বল্পতা সত্ত্বেও তারা সেবা সচল রাখার চেষ্টা করছেন।

প্রেমপত্রের অবলুপ্তি আর তালাকপত্রের হার বৃদ্ধি—কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুর অবস্থার গল্প নয়, বরং আমাদের সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা ও ডিজিটাল যুগের আধুনিক জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলছে।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: