
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বর্ষা শেষে পদ্মায় এমন তীব্র স্রোত ও ভাঙন আগে কখনো দেখা যায়নি। তাঁদের মতে, বাগড়া ঘাট থেকে দিয়ারা ও চরনাসিরপুর-ঝাউকান্দা হয়ে পদ্মা নদীশাসনের মাত্র ১৭ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ স্থগিত রয়েছে। এতে নদীর স্রোতের মূল প্রবাহ সদরপুরের দিকে ঘুরে গেছে বলে তাঁদের ধারণা। পদ্মার সদরপুর অংশে দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ বা নদীশাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তীব্র ভাঙনে বিস্তীর্ণ জনপদ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী ঘাট, চেয়ারম্যান ঘাট ও মুন্সীরচর এবং পার্শ্ববর্তী চরনাছিরপুর ইউনিয়নের বাবুরালি মোল্যার কান্দি, শিমুলতলী, নাজির শিকদার কান্দি, মনিরদ্দিন ফকির কান্দি, কাজি কান্দি ও শিকদার কান্দিসহ বিস্তীর্ণ নদীতীরজুড়ে ভাঙন চলছে। নদীতীরের বাসিন্দারা বসতভিটা নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিলেও তাঁদের ফসলি জমি রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা আধাপাকা ও কাঁচা ধান গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে চরনাসিরপুর ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভবন, ঢেউখালী ইউনিয়নের শতবর্ষী পিঁয়াজখালী হাট, জনসংঘ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, চরনাসিরপুর উচ্চবিদ্যালয়, বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, ছোট-বড় বাজার ও জনবসতি। এতে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শয়তানখালী ঘাটের ইজারাদার মানিক ব্যাপারী বলেন, “যে হারে নদীভাঙন চলছে, তাতে আগামী বছর পিঁয়াজখালী হাট বলে আর কিছু থাকবে না।”
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন বলেন, “শুনেছি, উজানে নদীশাসনের কাজ বন্ধ রয়েছে এবং সেখানে বিশাল বালুর স্তূপ জমে আছে। এর ফলে নদীর স্রোতের গতিপথও পরিবর্তিত হতে পারে।”
জনসংঘ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আইয়ুব আলী বলেন, “নদীভাঙন অত্যন্ত তীব্র। প্রতিদিনই ভাঙন বাড়ছে। আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। কখনো ভাবিনি, এত অল্প সময়ের মধ্যে নদী আমাদের এতটা কাছে চলে আসবে।”
নদীভাঙনের শিকার চরনাসিরপুরের কৃষক জয়নাল আধাপাকা ধান কাটতে কাটতে বলেন, “আর কিছুদিন সময় পেলেই ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন বাধ্য হয়ে তা গরুর খাদ্য হিসেবে কেটে নিয়ে যাচ্ছি।”
চরনাসিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রোকন উদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভবনটিও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে এ ইউনিয়নটি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢেউখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বয়াতি বলেন, “আমার জীবনে এত তীব্র ভাঙন দেখিনি। চোখের সামনে মাত্র ২০ মিনিটে ৫০০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রস্থের একটি এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না। ভাঙনের গতি ভয়াবহ। তাই সরকারের উচিত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ বা নদীশাসনের কাজ বাস্তবায়ন করা।”
এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, “এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সরকার অবগত রয়েছে। পদ্মা নদীশাসনের বিষয়টি প্রকল্প আকারে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) তোলা হয়েছে। বর্তমানে তা পর্যালোচনাধীন রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে কাজ করছেন। আশা করি, খুব শিগগিরই একটি স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে।”