
পুলিশের দাবি, রাকিবকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ ডিমলায় এনে মাটিচাপা দেওয়া হয়। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিব জীবিত আছেন—এমন ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছ থেকে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ নেওয়া হয়। এ ঘটনায় আরও দুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উদ্দোমপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের খাদেমুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলাম এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ঢাকায় যান। গত ১ আগস্ট তিনি রাজধানীর কাফরুল থানার শেওড়াপাড়ার একটি মেসে ওঠেন। সেখানে অনলাইনের মাধ্যমে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া বসুনিয়াপাড়া গ্রামের আফসার আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।
পরিচয়ের সূত্র ধরে মামুনের সঙ্গে রাকিবের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পুলিশ জানায়, মামুন ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় রিনা নামের এক নারীর কাছ থেকে বাসা ভাড়া নিয়ে অনলাইনে কসমেটিকসের ই-কমার্স ব্যবসা করতেন। ওই বাসায় রাকিবের যাতায়াত ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গত ১৬ আগস্ট রাকিব মামুনের ভাড়া বাসায় গেলে তাঁদের মধ্যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে রাকিবকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে মরদেহ একটি কার্টনে ভরে রাতে ঢাকা থেকে ডিমলায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর মামুনের বাড়ির পাশে মরদেহটি মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর বড় ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন কাফরুল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় অপহরণের অভিযোগে মামলা করা হয়। তদন্তে পুলিশ রাকিবকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের বিষয়টি সামনে আনে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ অক্টোবর ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার ওই ভাড়া বাসা থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে রাকিবের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য যাচাই করতে তাঁকে নীলফামারীর ডিমলার বালাপাড়া এলাকায় নেওয়া হয়।
মামুনের দেখানো স্থান অনুযায়ী ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তায় কাফরুল থানা পুলিশ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বালাপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় মাটিচাপা অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
কাফরুল থানার এসআই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র রায় বলেন, রাকিবের বড় ভাই প্রথমে নিখোঁজের বিষয়ে জিডি করেন। পরে ৫ অক্টোবর অপহরণ মামলা দায়ের হলে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিমলা থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, রাকিবকে হত্যার পর বিষয়টি গোপন রাখতে মামুন এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে রাকিব জীবিত আছেন—এমন ভিডিও তৈরি করেন। ওই ভিডিও দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছে বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার মামুন জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, মুক্তিপণের টাকা তিনি একা নেননি। দিনাজপুরের রতন ও নুর জামাল নামের আরও দুজন এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন এবং তিনজন মিলে টাকা ভাগ করে নেন।
এদিকে ঢাকা থেকে একটি মরদেহ কীভাবে ডিমলায় নেওয়া হলো, হত্যাকাণ্ডে মামুনের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিলেন কি না এবং মুক্তিপণের অর্থ কীভাবে ও কার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া শেষে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা বা হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি নয় পুলিশ।