বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রস্তাবিত ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে গবেষণা অর্থায়ন পরিচালনার সাধারণ নির্দেশিকা, ২০২৬’ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) শিক্ষকরা। নীতিমালায় পদমর্যাদা ও পিএইচডি ডিগ্রিকে গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ তুলে তা সংশোধনসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষকরা। পরে চার দফা দাবি ও সুপারিশসংবলিত স্মারকলিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেন তারা।
মানববন্ধনে শিক্ষকেরা বলেন, গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা শুধু একজন শিক্ষকের পদ বা ডিগ্রি দিয়ে নির্ধারণ করা যৌক্তিক নয়। গবেষণা প্রস্তাবের মান, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, গবেষণার অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, দল পরিচালনা এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত নীতিমালা কার্যকর হলে গবেষণায় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকরা শুধু পদমর্যাদার কারণে প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর (পিআই) হিসেবে আবেদন করার সুযোগ হারাতে পারেন। একইভাবে পিএইচডি না থাকায় অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদেরও গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার সুযোগ থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানববন্ধনে শিক্ষকরা জানান, পাবিপ্রবিতে ২১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশের পিএইচডি ডিগ্রি নেই। ফলে পিআই হিসেবে আবেদন করতে পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষক গবেষণায় স্বাধীনভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তাদের মতে, পিএইচডি একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক যোগ্যতা হলেও গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা যাচাইয়ের একমাত্র মানদণ্ড এটি হতে পারে না। বরং একজন শিক্ষকের গবেষণার অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, প্রস্তাবনার মান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস এম শাহেদুল আলম, সহকারী অধ্যাপক আশিকুর রহমান অভি, ইইই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম, পরিসংখ্যান বিভাগের প্রভাষক ড. নাফিস হোসাইন, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা ইয়াসমিনসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা মানববন্ধনে বক্তব্য দেন।
সহকারী অধ্যাপক আশিকুর রহমান অভি বলেন, ইউজিসির গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান। তবে নীতিমালার কিছু বিধান প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক এবং কিছু ক্ষেত্রে সহযোগী অধ্যাপকদের গবেষণায় বৈষম্যের মুখে ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, তাঁর বিভাগে কোনো শিক্ষক পিএইচডিধারী না হলেও গবেষণা কার্যক্রম থেমে নেই; বরং অনুষদের মধ্যে তাদের গবেষণার কার্যক্রম ভালো। তাই তরুণ গবেষকদের উৎসাহিত করতে নীতিমালাটি দ্রুত সংশোধনের দাবি জানান তিনি।
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান নিজে পিএইচডিধারী হলেও প্রস্তাবিত নীতিমালায় ডিগ্রির ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, গবেষণা গ্রান্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে পিএইচডিধারী শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। মফস্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনিতেই গবেষণার সুযোগ-সুবিধা ও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন বৈষম্য যুক্ত হলে অনেক শিক্ষক গবেষণা থেকে পিছিয়ে পড়বেন।
তাঁর ভাষ্য, গবেষণায় প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত যোগ্যতা, গবেষণার মান ও প্রস্তাবনার ভিত্তিতে—কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রির ভিত্তিতে নয়।
চার দফা দাবিতে স্মারকলিপি
মানববন্ধন শেষে শিক্ষকরা চার দফা দাবি ও সুপারিশসংবলিত স্মারকলিপি দেন। তাদের দাবিগুলো হলো—
১. প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকসহ সব পর্যায়ের শিক্ষকদের পিআই হিসেবে আবেদন করার সমান সুযোগ দিতে হবে। গবেষণা অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা ও গবেষণা প্রস্তাবের মানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
২. পিএইচডিবিহীন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য না করে তাদের প্রকাশনা, গবেষণা অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও প্রস্তাবের মান বিবেচনায় নিতে হবে।
৩. শিক্ষকের পদমর্যাদার পরিবর্তে প্রমাণিত গবেষণা-যোগ্যতা ও গবেষণা প্রস্তাবের মানকে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি করতে হবে।
৪. নবীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা ও পূর্ববর্তী গবেষণা অনুদান ব্যবস্থার নজির বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন নীতিমালা প্রণয়ন বা সংশোধনের আগে শিক্ষক-গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে।
শিক্ষকদের দাবি, গবেষণার সুযোগ যত বেশি উন্মুক্ত ও যোগ্যতাভিত্তিক হবে, ততই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন গবেষক তৈরি ও গবেষণার পরিধি বাড়বে। তাই ইউজিসির প্রস্তাবিত নীতিমালায় বৈষম্যমূলক বিধান থাকলে তা পুনর্বিবেচনা করে গবেষকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।