চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা ভূমি অফিস ও বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে দালালদের দৌরাত্ম্য এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়ে সরাসরি সেবা নিতে গেলে নানা অজুহাতে তাদের দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে। অথচ অতিরিক্ত টাকা দিলে দালালের মাধ্যমে দ্রুত কাজ হয়ে যাচ্ছে।
নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান সংশোধন, মিস মামলা, শুনানি ও মিউটেশন ফাইল অনুমোদনসহ বিভিন্ন সেবায় ঘুষ দাবির অভিযোগ করেছেন স্থানীয় একাধিক সেবাগ্রহীতা। তাদের দাবি, টাকা না দিলে ফাইলে ত্রুটি দেখানো, ফাইল আটকে রাখা কিংবা হারিয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়।
এচিয়া ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, রেজিস্ট্রি করা জমির নামজারির জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে তাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়। পরে অনৈতিকভাবে টাকা দাবি করা হলে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
চরতী ইউনিয়নের জীবন তালুকদারের অভিযোগ, ভূমি অফিসের বিভিন্ন টেবিলে ঘুষ ছাড়া ফাইল এগোয় না। নামজারি খতিয়ান অনলাইন করা, খতিয়ান সংশোধন, মিস মামলার প্রতিবেদন এবং মিউটেশন ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
কাঞ্চনা ইউনিয়নের সেবাগ্রহীতা নুরুল কবির বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদলির পর ফাইল অনুমোদনের নামে নতুন করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কানুনগো ও সার্ভেয়ারদের প্রতিবেদন পেতেও টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা বা হারিয়ে যাওয়ার ভয় দেখানোর কথাও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান চেয়্যারম্যান বলেন, সরেজমিনে ভূমি অফিস পরিদর্শনে গিয়ে এসিল্যান্ড না থাকা এবং জনবল সংকটের বিষয়টি তারা দেখেছেন। এতে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে সম্প্রতি কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সরকারি দপ্তরে অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে এসিল্যান্ড না থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, ভূমিসেবা জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সাতকানিয়ার ভূমি অফিসগুলোতে অনিয়ম ও দালালদের আধিপত্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে দালালচক্রের যোগসাজশ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সাতকানিয়া আদালতের আইনজীবী হাফিজুল ইসলাম মানিক বলেন, ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সীমিত ধারণার সুযোগ নিচ্ছে একটি মহল। সরকারি সেবা পাওয়া নাগরিকের অধিকার। ঘুষের বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করানো ও নাগরিকদের হয়রানি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগীরা তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করলে তাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ভূমি অফিসে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়গুলোতে সেবাপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, অভিযোগ বাক্স চালু এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।