কর্ণফুলীর তীরে শুঁটকির ধুম, কোটি টাকার বাণিজ্যে জমজমাট চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা

সারাদেশ

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি পল্লীগুলোতে। কর্ণফুলী নদীর দুই তীর ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় রোদ-বাতাসে

2026-10-01T17:11:01+00:00
2026-10-01T17:11:01+00:00
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
কর্ণফুলীর তীরে শুঁটকির ধুম, কোটি টাকার বাণিজ্যে জমজমাট চট্টগ্রাম
প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদন, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের বাজারেও
চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি পল্লীগুলোতে। কর্ণফুলী নদীর দুই তীর ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় রোদ-বাতাসে মাছ শুকানোর ব্যস্ততা এখন চোখে পড়ার মতো। বাঁশের মাচাংজুড়ে সারি সারি মাছ, শ্রমিকদের ব্যস্ততা আর ব্যবসায়ীদের কেনাবেচায় শীতের মৌসুমে জমে উঠেছে শুঁটকির বাণিজ্য।

বছরের প্রায় ১০ মাস কমবেশি শুঁটকি তৈরি হলেও অক্টোবরের শেষ থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কে মূল মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। অনুকূল আবহাওয়া, কম আর্দ্রতা ও পর্যাপ্ত রোদের কারণে এ সময়ে মাছ দ্রুত শুকানো যায়। চট্টগ্রামের শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুমও সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।

কর্ণফুলীর তীরে শত শত মাচাং
নগরীর কর্ণফুলী নদীর উত্তর ও দক্ষিণ তীরঘেঁষা বাকলিয়া, ইছানগর, ডাঙ্গারচর, কর্ণফুলী ঘাট, ফিশারি ঘাট, চাক্তাই ও রাজাখাল তীরবর্তী এলাকায় শুঁটকি তৈরির ব্যস্ততা বেড়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এসব এলাকায় ছোট-বড় বিভিন্ন স্পটে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছ শুকানো হয়। ছুরি, লইট্টা, ফাইস্যা, লাক্ষ্যা, কোরাল, রূপচাঁদা, পোয়া, চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছের শুঁটকি তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতীরবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শুঁটকি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কয়েক বছর আগের এক প্রতিবেদনে কর্ণফুলীর তীরের একটি প্রধান শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্রে প্রায় ২০ প্রজাতির মাছ শুকানোর চিত্র উঠে এসেছিল।

মাছ থেকে শুঁটকি, কয়েক ধাপের প্রক্রিয়া
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকেই শুঁটকি পল্লীতে শুরু হয় শ্রমিকদের ব্যস্ততা। ট্রলার ও বিভিন্ন উৎস থেকে আসা মাছ প্রথমে বাছাই করা হয়। এরপর মাছের পেট পরিষ্কার করে ধুয়ে নেওয়া হয়। প্রজাতি ও আকার অনুযায়ী মাছগুলো বাঁশের তৈরি চাঙ বা মাচাংয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়।

রোদ ও বাতাসের ওপর নির্ভর করে একেক ধরনের মাছ শুকাতে সময় লাগে এক থেকে তিন সপ্তাহ। শুকানোর পর শুঁটকি বাছাই, স্তূপ করা, সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষসহ বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যুক্ত থাকেন। ফলে শুঁটকি শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী বহু মানুষের জীবিকারও উৎস।

‘ফরমালিনমুক্ত’ শুঁটকির দাবি
ব্যবসায়ীদের দাবি, কর্ণফুলীতীরের অনেক শুঁটকি প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদন করা হয় এবং ফরমালিন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে মাননিয়ন্ত্রণ জরুরি।

চট্টগ্রামের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ১৪টি ড্রাই ফিশ ফ্যাক্টরি রয়েছে। মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি কাঠামোর আওতায় এসব প্রতিষ্ঠান তদারকি করা হয়।

কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা
চট্টগ্রাম শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আজগর হোসেন বলেন, প্রতি মৌসুমে এখানে কোটি কোটি টাকার শুঁটকি কেনাবেচা হয়। শীতের মৌসুমে চাহিদা বাড়ায় ব্যবসায়ীরাও ভালো লাভের প্রত্যাশা করছেন।

তিনি বলেন, শুঁটকি উৎপাদনের জন্য একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত শুঁটকিপল্লী গড়ে তোলা হলে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন আরও সহজ হবে। এতে এই খাতের ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আছদগঞ্জের মেসার্স আলমগীর ব্রাদার্সের মালিক জানান, শীতকালে শুঁটকির বিভিন্ন পদের চাহিদা বাড়ে। ফলে এই সময়ে উৎপাদন ও বেচাকেনা দুটোই বেড়ে যায়।

কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটা এলাকার ইছানগর ও ডাঙ্গারচরে শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শেখ আহমদ ও কালা মিয়া জানান, অনেক ব্যবসায়ী মাছ ধরার ট্রলিতে আগাম বিনিয়োগ করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করেন। বিশেষ করে হাঙরসহ সামুদ্রিক মাছের একটি অংশ শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের বাজারে
চট্টগ্রামের শুঁটকির বাজার শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকের মাধ্যমে শুকনা ও লবণযুক্ত মাছ দেশের বাইরেও যাচ্ছে।

মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তালিকায় চট্টগ্রামের একাধিক লাইসেন্সপ্রাপ্ত cured fish exporter বা শুঁটকি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরী ও কর্ণফুলী এলাকার প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) রপ্তানিকারক ডেটাবেজেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য তালিকায় ‘Fish, salted, dried...’ বা লবণযুক্ত ও শুকনা মাছের শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়াতে হলে স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, আধুনিক শুকানোর ব্যবস্থা, প্যাকেজিং ও মাননিয়ন্ত্রণের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

মাছ কমে যাওয়ায় উৎপাদনেও প্রভাব

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, একসময় চট্টগ্রামে শুঁটকির উৎপাদন অনেক বেশি ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে জেলেদের জালে আগের তুলনায় কম মাছ ধরা পড়ায় শুঁটকি উৎপাদনেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

তাঁর মতে, সমুদ্র ও উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) চট্টগ্রাম মৎস্য বন্দরের মহাব্যবস্থাপক কমান্ডার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান (জি), পিএসসি, বিএন বলেন, চট্টগ্রামের শুঁটকি শুধু স্থানীয় খাদ্যপণ্য নয়; এটি দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতিরও একটি অংশ। নিরাপদ পদ্ধতিতে উৎপাদন, স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামো ও সুষ্ঠু বিপণন নিশ্চিত করা গেলে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

আধুনিক শুঁটকিপল্লীর দাবি
শুঁটকি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি—কর্ণফুলীর তীরবর্তী বিচ্ছিন্ন ও অস্থায়ী উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর পরিবর্তে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি পরিকল্পিত শুঁটকিপল্লী গড়ে তোলা।

সেখানে মাছ পরিষ্কার, শুকানো, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের আলাদা ব্যবস্থা থাকলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে পণ্যের মানও উন্নত হবে। একই সঙ্গে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় মান বজায় রাখা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শীতের রোদে এখন কর্ণফুলীর তীরে তাই শুধু মাছ শুকাচ্ছে না, শুকাচ্ছে বহু মানুষের জীবিকার স্বপ্নও। সঠিক পরিকল্পনা, মাননিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও বড় পরিসরে জায়গা করে নিতে পারে।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: