সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ১ হাজার ৮৯৩টি গাছ কাটার ঘটনায় বন বিভাগ ও সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা দিয়েছে। বন বিভাগের দাবি, সওজের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাছগুলো কাটা হচ্ছে। তবে সওজ বলছে, ওই অংশে গাছ কাটার জন্য তারা কোনো আবেদন করেনি। এদিকে গাছ কাটার বিষয়ে কোনো অনুমতি নেয়নি সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)।
সম্প্রতি টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে গাছ কাটার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও পড়ে রয়েছে কাটা গাছের গুঁড়ি ও ডালপালা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব গাছ সড়কের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পথচারী ও এলাকাবাসীকে ছায়া দিয়ে আসছিল। প্রয়োজন ছাড়াই গাছ কাটায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
গাছ কাটার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার আয়নাল হক জানান, টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত ১ হাজার ৮৯৩টি গাছ কাটার তালিকা রয়েছে। বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী গাছ কাটার কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ছয় লেন প্রকল্পটি দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার থেকে পীর হবিবুর রহমান চত্বর ও শাহপরান সেতু হয়ে সুরমা গেট এলাকায় তামাবিল সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর তামাবিল মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা। তবে টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত অংশটি চার লেন প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয় বলে জানিয়েছে সওজ।
প্রকল্পের বাইরে থাকা অংশে এত বিপুলসংখ্যক গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পের কথা বলে গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। তবে গাছ কাটার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সাংবাদিক জিয়া আহমদ বলেন, টিলাগড় থেকে বাইপাস পর্যন্ত গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। রাস্তার কোনো প্রকল্পের কাজ না থাকলে গাছগুলো কী কারণে কাটা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সওজ ও বন বিভাগের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সিনিয়র সাংবাদিক কবির আহমদ সোহেল অভিযোগ করেন, প্রকল্প না থাকা সত্ত্বেও গাছ কাটার টেন্ডার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিটি গাছের বাজারমূল্য ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা হতে পারে। অথচ গাছগুলো প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮০ জন লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা বলে অভিযোগ করেন তিনি। গাছ কাটার অনুমোদন, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বিক্রয়মূল্য খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান এই সাংবাদিক।
সিলেটের পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আবদুল করিম কিম বলেন, উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা হলে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গাছ কাটার বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, সওজের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই মহাসড়কের দুই পাশের গাছ কাটা হচ্ছে। এ কারণে প্রকল্পের বাইরের অংশের গাছও কাটা হচ্ছে। গাছগুলো সামাজিক বনায়নের আওতায় লাগানো হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তবে বন কর্মকর্তার এ বক্তব্য অস্বীকার করেছেন সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুল বাশার মো. সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত অংশটি চার লেন প্রকল্পের বাইরে। সেখানে গাছ কাটার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এ অংশের গাছ কাটার জন্য বন বিভাগকে সওজের পক্ষ থেকে কোনো আবেদনও করা হয়নি। বন বিভাগ কেন গাছ কাটছে, তা তাঁদের বোধগম্য নয়।
অন্যদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাউয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন, গাছ কাটার বিষয়ে সিসিকের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। সড়কটি সওজের আওতাধীন এবং গাছ কাটার কাজ করেছে বন বিভাগ। তাই গাছ কাটার কারণ এবং কাটা গাছের গুঁড়ি সড়কের পাশে ফেলে রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুই বিভাগই ব্যাখ্যা দিতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব মূলত নিজস্ব সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্ট্রিট লাইট রক্ষণাবেক্ষণ করা। তবে সিসিকের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সামিম আহমদ বলেন, গাছ কাটার সময় তাঁর দোকানের সামনের বিভিন্ন জিনিসপত্র ও স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের আওতাভুক্ত ও আওতাবহির্ভূত অংশ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে ১ হাজার ৮৯৩টি গাছ কাটার বিষয়টি তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে গাছ কাটার অনুমোদন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিক্রয়মূল্য ও গাছ কাটার যৌক্তিকতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটা হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কাটা গাছের পরিবর্তে নতুন করে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।