নিজস্ব প্রতিবেদক : মাদকাসক্তি থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা শুধু মাদক গ্রহণ বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনা, আত্মনির্ভরশীল হওয়া, পরিবার ও সমাজে স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসা এবং কর্মজীবনে যুক্ত হওয়াও রিকভারির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের সহযোগিতা প্রয়োজন।
‘রিকভারি ডে ২০২৬’ উপলক্ষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সভাকক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সাবসটেন্স ইউজ প্রফেশনালস (আইসাপ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
এ বছর ‘রিকভারি মাস’-এর প্রতিপাদ্য ‘রিকভারি ইজ রিয়েল: রিস্টোরিং এভরি অ্যাসপেক্ট অব লাইফ’। বক্তারা বলেন, চিকিৎসার পর একজন ব্যক্তি যদি পুরোনো পরিবেশ, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা সামাজিক কলঙ্কের মধ্যে ফিরে যান, তাহলে পুনরায় মাদক গ্রহণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এ মোহিত কামাল বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার, আফটারকেয়ার, পিয়ার সাপোর্ট, পুনরায় মাদক গ্রহণ প্রতিরোধ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ জরুরি। তাঁর মতে, মাদকনির্ভর ব্যক্তিকে অপমানজনক পরিচয়ে না দেখে একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চিকিৎসা চান ৬৯ শতাংশ, সুযোগ পেয়েছেন ১৩ শতাংশ
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক এবং আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাসুদ।
তিনি জাতীয় গবেষণার তথ্য তুলে ধরে জানান, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশের মাদক গ্রহণ শুরু হয়েছে ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের প্রয়োজনের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসা বা পুনর্বাসনসেবা পেয়েছেন মাত্র ১৩ শতাংশ। এ ব্যবধান দেশে মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবার ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট করে।
বক্তারা বলেন, মাদকনির্ভরতার বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট সেবা যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
এ ছাড়া চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি এবং নারী ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তাদের মতে, রিকভারি একটি চলমান প্রক্রিয়া। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের সহযোগিতা একজন মানুষকে সুস্থ জীবন ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কলঙ্ক নয়, সহমর্মিতা এবং বর্জন নয়, অন্তর্ভুক্তির পরিবেশই হতে পারে নতুন জীবনে ফেরার পথ।