ইটিপি ছাড়াই ১৪ চালকল! বর্জ্যপানিতে বিষাক্ত হচ্ছে খাল-ফসলি জমি

আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা

সারাদেশ

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে পরিবেশগত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই একাধিক অটোমেটিক চালকল পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এসব

2026-09-30T17:40:07+00:00
2026-09-30T17:40:07+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬,
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
ইটিপি ছাড়াই ১৪ চালকল! বর্জ্যপানিতে বিষাক্ত হচ্ছে খাল-ফসলি জমি
আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে পরিবেশগত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই একাধিক অটোমেটিক চালকল পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এসব মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া সেকশন থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধযুক্ত ও অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সরাসরি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে পানি দূষণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবাদি জমি ও জলজ পরিবেশ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সান্তাহার এলাকার বিভিন্ন অটোরাইস মিল থেকে বর্জ্যপানি নিষ্কাশন করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে খাল-বিলের পানি দূষিত হয়ে পড়ছে এবং মাছসহ জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সান্তাহার এলাকায় বুশরা অটো রাইস মিল, সুন্দরী অটো রাইস মিল, ইছামতী, ফুলজান, সালমান, এমবি, বৈশাখীসহ প্রায় ১৪টি অটোরাইস মিল রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া সেকশন থেকে নির্গত বর্জ্যপানি পরিশোধন না করেই বিভিন্ন খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বুশরা অটো রাইস মিলের বর্জ্যপানি রেলের জায়গা দিয়ে ফসলি জমির পাশ দিয়ে ইরামতি খালে গিয়ে পড়ছে। এমবি এগ্রো ফুডস ও সালমান অটো রাইস মিলের বর্জ্যপানি ড্রেনের মাধ্যমে ফসলি জমি পেরিয়ে সরাসরি ইরামতি খালে গিয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, অন্যান্য চালকলের ক্ষেত্রেও একইভাবে বর্জ্যপানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে।

বর্জ্যপানি ও ইরামতি খালের পানির নমুনা সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার তথ্যে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO), pH, অ্যামোনিয়া ও অ্যালকালিনিটির মাত্রায় অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, দ্রবীভূত অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি লিটারে ৩ থেকে ৬ মিলিগ্রাম থাকার কথা। সেখানে মিলের বর্জ্যপানিতে পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম।

পানির pH-এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ হলেও মিলের পানিতে পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৩ এবং খালের পানিতে ৬ দশমিক ৮।

অন্যদিকে অ্যামোনিয়ার স্বাভাবিক মাত্রা ০ দশমিক ০৫ থেকে ০ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম হওয়ার কথা থাকলেও মিলের পানিতে এর পরিমাণ ১০ মিলিগ্রামের বেশি এবং খালের পানিতে ১২ মিলিগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে বলে পরীক্ষার তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যালকালিনিটির স্বাভাবিক মাত্রা ২০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম হওয়ার কথা থাকলেও মিলের পানিতে পাওয়া গেছে মাত্র ০ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে শূন্য।

সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শিশির কুমার দে বলেন, নমুনা পরীক্ষায় মিল ও ইরামতি খালের পানি প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে। নমুনায় ছাই ও ধাতব উপাদানের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। হেভি মেটাল পরীক্ষা করা হলে ক্ষতিকর ধাতুর উপস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

স্থানীয় কৃষক লতিফুর রহমান বলেন, একসময় খালের পাশে গবাদিপশু পালন এবং মাছ ধরার মাধ্যমে স্থানীয়রা উপকৃত হতেন। এখন পানিতে দুর্গন্ধ ছড়ানোয় খালের আশপাশে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। খালসংলগ্ন জমিতে গাছপালা হলেও আগের মতো ফলন হচ্ছে না। পচা পানিতে মাছও টিকে থাকতে পারছে না।

সান্তাহার নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এস রোশদানী বলেন, খাল-বিলের মাছ একসময় স্থানীয় মানুষের আমিষের অন্যতম উৎস ছিল। কিন্তু কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যপানিতে ইরামতি খালের পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্জ্যপানি ফেলা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে বুশরা অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী হাফেজ বেলাল হোসেন বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকা একটি পুকুরে বর্জ্যপানি ফেলা হয়। তবে ড্রেন দিয়ে খালে যে পানি যায়, সেটি পরিষ্কার বলে দাবি করেন তিনি। অন্য মিল মালিকরাও একই ধরনের দাবি করেছেন।

বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান জানান, উল্লেখ করা ছয়টি মিলের মধ্যে বুশরা অটো রাইস মিলের ছাড়পত্র নবায়ন রয়েছে।

তবে মিলের দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত তরল বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশগত বিধিনিষেধ থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় দিনের পর দিন বর্জ্যপানি খাল-বিল ও কৃষিজমিতে পড়ছে। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় জলজ পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। দ্রুত বর্জ্যপানি নিষ্কাশন বন্ধ ও কার্যকর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: