খুলনার দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন খাল ও জলাশয়ে আড়াআড়ি চায়না দুয়ারি জাল, টোনাজাল, নেটজাল ও পাটাতন নেটের বেড়া দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। এতে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় খালগুলোর গভীরতা কমার পাশাপাশি বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বাজুয়া ও চড়া নদী, পূর্ব বাজুয়া, মৌখালী, খ্টাইল, নিশাখালী, কচাসহ বিভিন্ন খাল ও জলাশয়ে নিয়ম না মেনে আড়াআড়িভাবে জাল ও বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও খালের ওপর বসতঘর, বিভিন্ন স্থাপনা ও পাকা প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, সুন্দরবন উপকূলঘেঁষা দাকোপ উপজেলায় ২২৮টির বেশি খাল ও জলাশয় রয়েছে। এসবের মধ্যে অধিকাংশ সরকারি খাস খাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ইজারাদার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়মনীতি না মেনে খালের বিভিন্ন অংশ দখলে রেখে মাছ শিকার করছেন।
তাদের দাবি, খালের ওপর আড়াআড়ি জাল ও বেড়া দেওয়ায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে না পারায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে বীজতলা ও রোপা আমনের ক্ষতি বাড়ছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে খালে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় তরমুজ, রবি শস্য ও বোরো চাষে সেচ সংকট দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের আরও অভিযোগ, পলি মিশ্রিত পানি জাল ও বেড়ায় বাধাগ্রস্ত হওয়ায় খালের তলদেশে পলি জমছে এবং ধীরে ধীরে গভীরতা কমছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ জালে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা নিধন হচ্ছে। এতে মাছের প্রজনন ও স্থানীয় মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
কৈলাশগঞ্জ এলাকার গৌরাঙ্গ প্রসাদ রায় ও বটবুনিয়া এলাকার আজমীর সানাসহ স্থানীয়রা বলেন, উপজেলার বিভিন্ন খাল ও নদীতে ১০০ থেকে ৫০০ গজ পরপর চায়না জাল, বেহুন্দি জাল, টোনাজাল ও আড়াআড়ি নেটপাটা দিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায়। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, কিছু ইজারাদার মৎস্যজীবী সমিতির নামে নদী-খাল ইজারা নিয়ে পরে বিভিন্ন অংশ সাধারণ মানুষের কাছে ঘাট হিসেবে ব্যবহার বা মাছ ধরার জন্য দিয়ে দেন। ফলে মৎস্য সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা অবৈধ সব ধরনের জাল অপসারণ, নিয়মবহির্ভূত মাছ শিকার বন্ধ এবং কৃষির স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ খালগুলোর ইজারা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিউলি মজুমদার বলেন, খালে আড়াআড়ি টোনাজালসহ বিভিন্ন ধরনের জাল পেতে রাখলে স্বাভাবিকভাবে পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যাহত হয়। এতে ধীরে ধীরে খালের গভীরতা কমে যায়। বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের সেচ সংকট দেখা দিতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক জানান, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে থানা ও নৌ পুলিশের সহযোগিতায় দাকোপ, পানখালী, তিলডাঙ্গা ও বাজুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন খালে অভিযান চালানো হয়েছে।
তিনি জানান, অভিযানে ৬৩৭টি অবৈধ নেটপাটা, ২৪৩টি অবৈধ চারো, ৪৭৫টি অবৈধ রিংজাল, ৩৮৯টি চায়না দুয়ারি জাল, ৩৬ হাজার মিটার কারেন্ট জাল এবং সাতটি বেহুন্দি জাল জব্দ করা হয়। এ ছাড়া অবৈধ জালের সঙ্গে ব্যবহৃত সহস্রাধিক বাঁশের খুঁটিও জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়েছে।
মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ, দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নৌ পুলিশের সমন্বয়ে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।