রিকভারি মানে শুধু মাদক ছাড়ার নয়, নতুন জীবনে ফেরার যাত্রা

রাজধানী

মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠা মানে শুধু মাদক গ্রহণ বন্ধ করা নয়; বরং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি, জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন,

2026-09-30T18:49:13+00:00
2026-09-30T18:49:13+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬,
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানী
রিকভারি মানে শুধু মাদক ছাড়ার নয়, নতুন জীবনে ফেরার যাত্রা
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৯ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠা মানে শুধু মাদক গ্রহণ বন্ধ করা নয়; বরং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি, জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন, আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠা এবং নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের সহায়তা না থাকলে এই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

‘রিকভারি ডে ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সভাকক্ষে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সাবসটেন্স ইউজ প্রফেশনালস (আইসাপ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে ‘রিকভারি মাস’ হিসেবে পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘রিকভারি ইজ রিয়েল: রিস্টোরিং এভরি অ্যাসপেক্ট অব লাইফ’। যার বাংলা ভাবার্থ, ‘সেরে ওঠা বাস্তব: জীবনের প্রতিটি দিক পুনরুদ্ধার।’

চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের সহায়তা

অনুষ্ঠানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এ মোহিত কামাল বলেন, টেকসইভাবে সুস্থ থাকার জন্য শুধু চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে পরিবারের সহায়তা, চিকিৎসা-পরবর্তী সেবা (আফটারকেয়ার), পিয়ার সাপোর্ট, পুনরায় মাদক গ্রহণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রয়োজন।

তিনি বলেন, চিকিৎসা শেষে কেউ যদি আবার পুরোনো পরিবেশে ফিরে যান, বেকারত্বে থাকেন, পারিবারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন কিংবা সামাজিকভাবে কলঙ্কের শিকার হন, তাহলে তাঁর পুনরায় মাদক গ্রহণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

মাদকনির্ভর ব্যক্তিকে অপমানজনক কোনো পরিচয়ে না ডেকে একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান অধ্যাপক মোহিত কামাল।

তিনি বলেন, ‘একজন মানুষের বর্তমান সমস্যাই তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। কলঙ্ক নয়, সহমর্মিতাই রিকভারির পথকে সহজ করে।’

চিকিৎসা চান ৬৯ শতাংশ, সুযোগ পেয়েছেন ১৩ শতাংশ

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক এবং আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাসুদ।

তিনি সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছেন। মোট জনসংখ্যার হিসাবে এ হার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই মাদক গ্রহণ শুরু করছেন অনেকে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে মাদক সহজলভ্য।

ইকবাল মাসুদ বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন চান। তাঁদের মধ্যে ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছেন। অথচ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ১৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চাহিদার সঙ্গে সেবা পাওয়ার এই বড় ব্যবধান দেশে মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টি সামনে আনে। বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার অপ্রতুলতা এবং মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সম্পর্কে ভুল ধারণাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

মাদকনির্ভরতা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়

আলোচনায় বক্তারা বলেন, মাদকনির্ভরতার বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে এর মূল কারণ ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা আড়ালে থেকে যায়। মাদক ব্যবহার প্রতিরোধের পাশাপাশি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বক্তারা জানান, অনেক মানুষ মাদক থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনসেবা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

এ কারণে জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট ও কাউন্সেলিং সেবা যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। একই সঙ্গে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি এবং নারী ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

রিকভারি একটি চলমান প্রক্রিয়া

আলোচনায় দৈনিক ইত্তেফাকের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জামিউল আহসান শিপু, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘আশ্রয়’-এর পরিচালক মো. শামীম খান, সেফ হোম মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক লুৎফর রহমান মানিক এবং ‘উৎস’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন চৌধুরী সুমন বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের জ্যেষ্ঠ মনোবিজ্ঞানী রাখি গাঙ্গুলী।

বক্তারা বলেন, মাদকনির্ভরতা থেকে সেরে ওঠা একটি চলমান প্রক্রিয়া। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও একজন ব্যক্তিকে সুস্থ থাকার চর্চা অব্যাহত রাখতে হয়। পরিবার ও সমাজের সহায়তা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিবেশ সেই যাত্রাকে টেকসই করতে পারে।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন দীর্ঘদিন ধরে মাদক প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টার সাবস্ট্যান্স ইউজ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে পেশাজীবীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতির উন্নয়নে কাজ করছে।

রিকভারি মাস উপলক্ষে বক্তাদের আহ্বান—কলঙ্কের বদলে সহমর্মিতা, বিচারের বদলে সহায়তা এবং বর্জনের বদলে অন্তর্ভুক্তির পরিবেশ তৈরি করা। এমন পরিবেশ তৈরি হলে মাদকনির্ভর মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ আরও সহজ হতে পারে। তাঁদের বার্তা, সেরে ওঠা সম্ভব, নতুন জীবনও সম্ভব।


Loading...
Loading...

রাজধানী- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: