একসঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ছিল। ছিল নতুন সংসার সাজানোর নানা পরিকল্পনা। ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও কিনেছিলেন দুজনে মিলে। খিলগাঁওয়ে মা–বাবার বাসার পাশেই ভাড়া নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি বাসা। পরিকল্পনা ছিল, ধীরে ধীরে ঘরটি সাজিয়ে নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার। এরপর বরিশালে গিয়ে স্থায়ীভাবে সংসার শুরু করার স্বপ্নও দেখছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডেঙ্গু কেড়ে নিল চিকিৎসক আঁচল রায়ের প্রাণ। বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। স্ত্রীকে বাঁচাতে চিকিৎসক হিসেবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন স্বামী বিপ্লব চন্দ্র দাস। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরবিদায় নিয়েছেন আঁচল। রেখে গেছেন অসংখ্য স্মৃতি, অসমাপ্ত সংসার আর একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
আঁচল ও বিপ্লব দুজনই চিকিৎসক। ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। তবে চাকরির কারণে বিয়ের পরও তাঁদের নিয়মিত একসঙ্গে থাকা হয়নি। কখনো আঁচল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, আর বিপ্লব জামালপুরে কর্মরত ছিলেন। পরে একজন ঢাকায়, অন্যজন বরগুনায় দায়িত্ব পালন করেন। ছুটি কিংবা কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় এলে দেখা হতো তাঁদের। সেই অল্প সময়েই চলত সংসার নিয়ে নানা পরিকল্পনা।
সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন বিপ্লব। এরপর দুজনের স্বপ্ন আরও বড় হয়। বরিশালে বিপ্লবের বাড়ির এলাকায় পোস্টিং নিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করার পরিকল্পনা করেন তাঁরা। সংসার কিছুটা গুছিয়ে সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবছিলেন। কিন্তু ডেঙ্গুর ভয়াল থাবায় সব পরিকল্পনাই থমকে গেল।
জ্বর থেকে আইসিইউ, তারপর চিরবিদায়
গত ২১ সেপ্টেম্বর জ্বরে আক্রান্ত হন আঁচল। জ্বর নিয়েই সেদিন স্বামীর সঙ্গে পূজার কেনাকাটা করেছিলেন তিনি। পরে বাসায় পরীক্ষা করালে তাঁর প্লাটিলেট পাওয়া যায় এক লাখ। শারীরিক অবস্থাও তখন মোটামুটি ভালো ছিল। মুখে খাবারও খেতে পারছিলেন।
তবে স্ত্রীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বিপ্লব। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আঁচল তখন হাসপাতালে যেতে রাজি হননি। পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি।
এরপর দ্রুত কমতে থাকে তাঁর রক্তের প্লাটিলেট। একপর্যায়ে তা ২৫ হাজারে নেমে আসে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাঁকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন একটি কাজে বরিশালে ছিলেন বিপ্লব।
হাসপাতালে নেওয়ার পর আঁচলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। প্রথমে এইচডিইউ, পরে আইসিইউতে নেওয়া হয় তাঁকে। জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকেরা একের পর এক জটিল চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ করেন। চিকিৎসকদের পাশাপাশি স্ত্রীকে বাঁচানোর লড়াইয়ে যুক্ত হন বিপ্লবও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয় এই তরুণ চিকিৎসককে।
‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে’
আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা স্ত্রীকে সাহস জোগাচ্ছিলেন বিপ্লব। বারবার বলছিলেন, ‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে।’ চিকিৎসক হিসেবে তিনি জানতেন পরিস্থিতি কতটা জটিল। কিন্তু স্বামী হিসেবে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না প্রিয় মানুষটির চলে যাওয়ার আশঙ্কা।
বিপ্লবের বিশ্বাস ছিল, আঁচল তাঁকে ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন না। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে ২৭ সেপ্টেম্বর চিরবিদায় নেন আঁচল।
স্ত্রীর চিকিৎসার বিষয়ে বিপ্লব বলেন, আঁচল চিকিৎসার নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কোনো ওষুধ খেতে চাইতেন না। নিজেও ছিলেন মেধাবী চিকিৎসক। হাসপাতালে ক্যানুলা করানোর মতো বিষয়েও তাঁর ভয় ছিল। অথচ সেই আঁচলকেই শেষ পর্যন্ত এইচডিইউ ও আইসিইউতে থেকে একাধিক কষ্টদায়ক চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
স্ত্রীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে হারাতে হয়েছে বিপ্লবকে। তাঁর ভাষায়, চিকিৎসকদের পাশাপাশি নিজেও স্ত্রীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।
মেধাবী চিকিৎসক ছিলেন আঁচল
আঁচল ছিলেন মেধাবী চিকিৎসক। ছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া
নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় বিপ্লব ও আঁচলের পরিচয়। বিপ্লব ছিলেন পঞ্চম ব্যাচের শিক্ষার্থী, আর আঁচল সপ্তম ব্যাচের। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তাঁদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন তাঁরা।
পড়াশোনার প্রতি গভীর মনোযোগ ছিল আঁচলের। চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় পাস করেন। সেই অর্জনের খবর নিজের ফেসবুক পেজে পিন করে রেখেছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে বিভাগীয় পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আঁচল। শিগগিরই তাঁর চাকরি স্থায়ীকরণের তালিকায় নাম আসার কথা ছিল। পেশাগত জীবনে আরও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।
স্ত্রীর মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে গর্ব করতেন বিপ্লব। তাঁর ভাষায়, বিসিএস ও পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের ক্ষেত্রে আঁচল তাঁর চেয়েও এগিয়ে ছিলেন। কেউ চিকিৎসার পরামর্শ চাইলে বিপ্লব নিজের স্ত্রীকেই জিজ্ঞাসা করতেন। স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সেই গর্ব আজ শুধুই স্মৃতি।
যে ছবিটি আর দেখলেন না আঁচল
খিলগাঁওয়ে ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন বিপ্লব ও আঁচল। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল তাঁদের। এই ছবি-ভিডিওসহ স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়ে
স্ত্রীর মৃত্যুর পর ২৮ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে দুজনের একটি ছবি প্রকাশ করেন বিপ্লব। ছবিতে তাঁর পরনে ছিল আঁচলের দেওয়া পাঞ্জাবি। আর আঁচলের শাড়িটি দিয়েছিলেন বিপ্লবের ছোট বোন।
ছবিটি অনেক আগেই ফেসবুকে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। এ নিয়ে অভিমানও করেছিলেন আঁচল। অথচ সেই ছবিটি আর জীবিত অবস্থায় দেখে যেতে পারলেন না তিনি।
ছবিটি প্রকাশ করে বিপ্লব লিখেছেন, ‘ছবিটা আপলোড দিতে এতটা দেরি হবে বুঝতে পারি নাই।’
একটি সাধারণ ছবি প্রকাশের অপেক্ষাও যে কখনো জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে, বিপ্লবের এই উপলব্ধি যেন তারই প্রতিচ্ছবি।
সাদা গোলাপের অপেক্ষায় ছিল আঁচলের শেষ ইচ্ছা
আঁচল মাঝেমধ্যে মজা করে স্বামীকে বলতেন, তিনি যদি বিপ্লবের আগে মারা যান, তাহলে যেন তাঁর সমাধিতে সাদা ফুল নিয়ে যাওয়া হয়। কথাটি হয়তো দুজনের কাছে ছিল নিছকই হাসি-ঠাট্টা। কিন্তু সেই কথাই একদিন বাস্তবে পরিণত হলো।
স্ত্রীর শেষ ইচ্ছার কথা মনে রেখে তাঁর সমাধিতে সাদা গোলাপ নিয়ে যান বিপ্লব। যে মানুষটির সঙ্গে একসঙ্গে জীবন কাটানোর কথা ছিল, সেই মানুষটির সমাধিতে ফুল দিয়ে বিদায় জানাতে হয়েছে তাঁকে।
বিপ্লব বলেন, ‘আগে মাঝেমধ্যে আঁচল মজা করে বলত, সে আমার আগে মারা গেলে তাঁর সমাধিতে যেন সাদা ফুল নিয়ে যাই। ওর কথামতো আমি সাদা গোলাপ নিয়ে গেলাম...।’
স্ত্রীকে হারানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের শূন্যতার কথাও তুলে ধরেছেন বিপ্লব। তাঁদের আবার এক হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা লিখেছেন তিনি। তাঁর সেই কথায় ফুটে উঠেছে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর গভীর বেদনা।
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সচেতন ছিলেন আঁচল ও বিপ্লব। বাসায় মশারি টানানোসহ মশার কামড় থেকে বাঁচতে নানা সতর্কতা অবলম্বন করতেন তাঁরা। তারপরও কোথায় আঁচল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা জানা যায়নি।
একটি ছোট্ট বাসা, কেনা ফ্রিজ-আসবাবপত্র, একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা—সবই ছিল তাঁদের সামনে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সংসার আর গড়ে উঠল না। খিলগাঁওয়ের সেই বাসায় পড়ে রইল সংসার সাজানোর উপকরণ। আর বিপ্লবের জীবনে রয়ে গেল প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর অসহনীয় শূন্যতা।