জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বনানী থেকে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৪ (এসআরবি-৪)। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বনানীর সি ব্লক এলাকায় এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১-এর যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবি জানিয়েছে, প্রায় ১২ বছর ধরে অবৈধ আদম ব্যবসা ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে আরজু রহমানের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময় লাইসেন্সবিহীন বিভিন্ন এজেন্সির নাম ব্যবহার করে বিদেশে লোক পাঠানোর কার্যক্রম চালাতেন তিনি। এর মধ্যে ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অভিযোগ রয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশের বেকার যুবক ও প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিত চক্রটি। সার্বিয়া ও বেলারুশ হয়ে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এনএসআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুলাই মানবপাচার চক্রের প্রতারণার শিকার কামরুন নাহার নামের এক নারী সহায়তার জন্য সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তদন্তে কামরুন নাহার, ফাতেমা, আঞ্জুমান আরা, পারভেজ, ফিরোজ ও মেহেদী হাসানসহ একাধিক ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার তথ্য উঠে আসে।
চক্রটি প্রথমে ভুক্তভোগীদের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠাত। পরে নেপাল বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মিশর ও লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হতো বলে জানিয়েছে এসআরবি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, চক্রটির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগী বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। কামরুন নাহারকে মিশরে এবং আঞ্জুমান আরাকে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখান থেকে তারা এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আরজু রহমান গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এ ছাড়া আরও প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগীর সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন সময়ের ঘটনা, মামলা, অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই চক্রের মাধ্যমে দুই হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে জনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।
এ ছাড়া ভুয়া ভিসা ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে নারীদের বিদেশে পাচার এবং সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে। এতে রাজি না হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। কোনো কোনো নারীকে জিম্মি করে রাখা এবং সিগারেট দিয়ে শরীরে জখম করার মতো নির্যাতনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
মিশরে অবস্থানরত কয়েকজন ভুক্তভোগী কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি। এখনও বেশ কয়েকজন নারী মিশরে আটক রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে।
এসআরবি জানায়, ২০২৫ সাল থেকে চলতি ২০২৬ সাল পর্যন্ত র্যাব ও এসআরবির অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ২২৩ জন মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরজু রহমানের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নিতে তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সহযোগী ও চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।