দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া ও ট্যারিফ ঘাটতি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সেই বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে সরকারের দায় কমছে না; বরং নতুন নতুন কেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি, ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা যুক্ত হচ্ছে। বর্তমানে মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর দুটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট করে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের বকেয়া ও ট্যারিফ ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কেন্দ্রের বকেয়াই প্রায় ৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা, ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ এবং বিদেশি ঋণের কিস্তির চাপ সামলাতে দ্রুত বকেয়া অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ সচিবকে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু বকেয়া পরিশোধ করলেই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয়মূল্য, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি ব্যয় ও গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফের মধ্যে সমন্বয় না হলে এক কেন্দ্রের বকেয়া মেটানোর পর আরেক কেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি তৈরি হবে। এতে ভর্তুকির চাপ প্রতিবছর আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নথি অনুযায়ী, আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের পটুয়াখালী কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ২০২৬ সালের ২৮ মে। অন্যদিকে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের ইউনিটগুলোর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর থেকেই ট্যারিফ ঘাটতির হিসাব হচ্ছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), গ্রাহক পর্যায়ে সেই বিদ্যুৎ বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে কম দামে। ফলে ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা দেওয়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে। পিডিবির হিসাবে, গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২ টাকা ৯৭ পয়সা, বিপরীতে বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে বড় অঙ্কের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে চলতি বছর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাহিদা ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পটুয়াখালীর কেন্দ্র ঘিরে সরকারের সামনে আরও একটি বড় আর্থিক দায় রয়েছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন ঋণ সিন্ডিকেট থেকে নেওয়া প্রকল্প ঋণের ৫০ শতাংশের জন্য বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়েছে। প্রথম কিস্তির আসল ও সুদ পরিশোধ করা হলেও পরবর্তী কিস্তির ১৩৬ দশমিক ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের দায় সামনে এসেছে। ফলে কেন্দ্রের পরিচালন ব্যয় ও বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি বিদেশি ঋণের কিস্তিও সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, বকেয়া পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা হলে কেন্দ্রটির পরিচালনা ও কয়লা সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতির কারণে যখন জাতীয় গ্রিডে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, তখন এসব কেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
একই সময়ে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের দায়ও বহাল থাকছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেও চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে ব্যবধানও সরকারের আর্থিক দায়ে পরিণত হচ্ছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি বলেছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি নতুন দায়ও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। তবে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার অতিরিক্ত ব্যয় সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো হবে না বলে তিনি জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বলেছেন, বিশেষ আইন বাতিল হলেও ওই আইনের অধীনে আগে করা চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে এবং চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের এই আর্থিক চাপ সামাল দিতে হলে শুধু বকেয়া পরিশোধ নয়, কেন্দ্রভিত্তিক উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ব্যয়, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি ও গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফ— সবকিছুর সমন্বিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। তা না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও সেই সক্ষমতা সচল রাখতে সরকারের ভর্তুকি ও আর্থিক দায় ধারাবাহিকভাবে বাড়তেই থাকবে।