বিশ্বজুড়েই বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার; পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। যার বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রিক। বিদ্যুতের লোডশেডিং ও বাড়তি উৎপাদন খরচের কারণে বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদন দুটোই বাড়ছে। গত দেড় দশকে দেশে সবুজ জ্বালানী সৌরবিদ্যুৎতের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি। তাই নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি খাতে বড় সম্ভাবনা এখন সৌরবিদ্যুতে। দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে এখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অপার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মাত্র চার বছরে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেওয়া হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ২০ হাজার কিলোমিটারের মতো উপকূল এলাকা আছে। সেখানে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের মতো বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানা যায়, দেশে গ্যাসের সংকট, জ্বালানি আমদানির চাপ আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে সৌরবিদ্যুৎ। সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, বাসাবাড়ি ও হাটবাজারের ছাদে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সৌর প্যানেল। ইতোমধ্যে ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। এবার অব্যবহৃত সরকারি ছাদ কাজে লাগিয়ে আরও প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদ ভবন, সরকারি হাসপাতাল থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান-বাদ যাচ্ছে না গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনাই। তথ্য বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুক্তি হয়েছে ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের, যার সক্ষমতা ১ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট। বর্তমানে ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আছে। এদের সক্ষমতা ৭৪৯ মেগাওয়াট। এর বাইরে ৫৮৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। বেসরকারি খাতে ২ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরও ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক অনুমোদন রয়েছে। এছাড়া ২২৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। এর বাইরে ২ হাজার ১৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৫টি প্রকল্প আছে পিডিবির পরিকল্পনায়।
বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ জানান, বিগত সরকারের সময়েও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনপ্রিয় করা যায়নি। কোন কোন কারণে জনপ্রিয় করা যায়নি, তা যাচাই-বাছাই করে এবার আমরা সব উদ্যোগ নিয়েছি। অন্যদিকে ভারত, ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তান-এসব দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সফলতার গল্পগুলো যাচাই করে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি, বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ব্যবস্থায় উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি ভবনের অব্যবহৃত ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং ব্যবস্থায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। এতে গ্রিডের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৫২ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত ১ হাজার ৪৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট এবং অফ-গ্রিড ৩৭৮ দশমিক ৫৬ মেগাওয়াট। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা। তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নেট মিটারিং করে বিদ্যুৎ বিক্রির আবেদন পড়েছে ৫ হাজার ৯২৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আরইবিতে ৩ হাজার ৪২০টি। এছাড়া পিডিবিতে ১ হাজার ৭০১টি, ডিপিডিসিতে ৮৪, ডেসকোতে ২৯২, ওজোপাডিকোতে ২০৪ এবং নেসকোতে ২২৬টি। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৯৬১টি এবং অনুমোদন করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৫৫টি। বাকি আবেদন বিভিন্ন প্রক্রিয়াধীন আছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সরকার শুধু প্যাকেজ ঘোষণা করলে চলবে না। এর মার্কেটিং বা সুফল জনগণকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগের উৎসের ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ এখন ৫০ শতাংশের বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।
সরকারের বড় পরিকল্পনা নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি নিয়ে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করতে কৌশলপত্র ঘোষণা করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, এখন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ২০৩০ সালে এই চাহিদা ২৫ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মোট চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। এই হিসাবে আগামী চার বছরের মধ্যে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা থাকতে হবে (বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ আসছে ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো)।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, নেট মিটারিং এর মাধ্যমে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের প্রসার ঘটাতে বড় ভূমিকা পালন করবে। কারণ এতে বিদ্যুতের গ্রাহক তার খালি ছাদ বা নিজস্ব জায়গায় সোলার বসিয়ে নিজে ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকারের কাছে সহজে বিক্রি করতে পারছে। এতে নিজে বিদ্যুতের চাহিদা মিটিয়ে অন্য গ্রাহককেও সহযোগিতা করতে পারবে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ছাদ এবং ভূমিভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে ৪২০ মেগাওয়াট, ২০২৭ সালে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, ২০২৮ সালে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট, ২০২৯ সালে ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ৩ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট ধরা হয়েছে ১৫০ মেগাওয়াট, বর্জ্য থেকে ২০০ এবং অন্যান্য উৎস থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে।
এ ব্যাপারে ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম সরকারের এই প্যাকেজ ঘোষণাকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সবুজ জ্বালানী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জমির ব্যবস্থা সরকারকে করে দিতে হবে। বিনিয়োগের জন্য শুল্ক-কর কমিয়ে সুবিধা দিতে হবে। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমাতে নতুন কেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হলে বিদেশি কোম্পানি প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। সরকারের নীতিতে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে বসে ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে, তারাই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।