আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার পথে এগোচ্ছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তিন দেশের সেনাপ্রধানদের একটি জরুরি বৈঠক আয়োজনের ঘোষণা এসেছে। বৈঠকে সৌদি আরবকে কীভাবে সামরিক ও প্রতিরক্ষাগত সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালানো হয়েছে। এতে দেশটির তেল সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হুতিদের দাবি, বৃহস্পতিবার তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। হামলার আশঙ্কায় মক্কা, জেদ্দা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেলবন্দর ইয়ানবুসহ বিভিন্ন এলাকায় জরুরি সতর্কতাও জারি করা হয়েছিল।
এর মধ্যেই সৌদি, পাকিস্তানি ও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মক্কায় বৈঠক করেন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, তিন দেশের মন্ত্রীরা মক্কা ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বৈঠকে তিন দেশের সেনাপ্রধানদের জরুরি বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হয়। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, সেনাপ্রধানদের বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তিটির মূল বিষয় হলো—চুক্তিভুক্ত কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে সব পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবকে ঘিরে পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্ব বাড়ছে।
এদিকে সৌদি আরবের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ দেশটির সেনাদের হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হুতিদের ক্ষমতা থেকে সরানো না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
অন্যদিকে ইরান হুতিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার এক মার্কিন টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, হুতিরা তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার এক দিন পর দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ানের মন্তব্য আসে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে এবং কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একই দিনে জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। ওই প্রস্তাবে লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সাত দিনের জন্য শত্রুতা বন্ধ, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা অর্থ ছেড়ে দেওয়া এবং তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার শর্ত রয়েছে বলে তিনি জানান।
আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এরপর পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু হতে পারে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে তেল সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। হুতিদের হামলার কারণে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতেও ট্যাংকার চলাচল সীমিত হওয়ার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে পাকিস্তান ও তুরস্ক কতটা সরাসরি ভূমিকা নেয়, সেনাপ্রধানদের আসন্ন বৈঠকের পর তা আরও স্পষ্ট হতে পারে।