বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে জলবায়ুর কষাঘাত, বিপন্ন উপকূলের জীবন

মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) সংবাদদাতা

সারাদেশ

৩০ বছরে কমেছে ফসলি জমি, বাড়ছে লবণাক্ততা ও অনাবাদি জমি | জীবিকার সংকটে অন্যত্র পাড়ি, প্রতারণার শিকার হয়ে ফিরছেন অনেকে

2026-09-23T19:09:24+00:00
2026-09-23T19:09:24+00:00
  শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে জলবায়ুর কষাঘাত, বিপন্ন উপকূলের জীবন
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) সংবাদদাতা
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৯ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
৩০ বছরে কমেছে ফসলি জমি, বাড়ছে লবণাক্ততা ও অনাবাদি জমি | জীবিকার সংকটে অন্যত্র পাড়ি, প্রতারণার শিকার হয়ে ফিরছেন অনেকে | সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট

একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে নোনা জল। মাঝখানে মানুষের বসতি। প্রতিদিনের জীবন এখানে প্রকৃতির সঙ্গে এক অনিশ্চিত লড়াই। কখনো বাঘ-কুমিরের ভয়, কখনো নদীভাঙন, আবার কখনো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। এর সঙ্গে গত কয়েক দশকে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত।

উপকূলের অনেক এলাকায় বাড়ছে লবণাক্ততা, কমছে ফসলি জমি, বাড়ছে অনাবাদি জমি। সংকট তীব্র হচ্ছে সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার। সুন্দরবন ও নদীনির্ভর মানুষ বছরের একটি বড় সময় আয়-রোজগারের অনিশ্চয়তায় থাকছেন। কেউ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন, আবার প্রতারণা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় অনেকে ফিরছেন নিজ ভিটায়।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা থেকে খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূল—বিশেষ করে শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদগুলোতে এই বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের বড় একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও প্রান্তিক কৃষকদের অনেকেই বন ও নদীকেন্দ্রিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

কিন্তু মাছ ও কাঁকড়া আহরণ কিংবা বনজ সম্পদ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারপ্রতি সীমিত সরকারি সহায়তা মিললেও তা দিয়ে দীর্ঘ সময়ের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

যতীন্দ্রনগর জেলেপাড়ার সুরমা (ছদ্মনাম) এমনই এক পরিবারের প্রতিনিধি। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে সুন্দরবনে যাওয়া শুরু করেছিলেন তিনি। এখন স্বামীর সঙ্গে নদী ও খালে মাছ-কাঁকড়া ধরে সংসার চালান।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় সেই পথও বন্ধ থাকে। তখন সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজের কোনো সঞ্চয় না থাকায় বিকল্প জীবিকার সন্ধান করছেন সুরমা।

সুন্দরবননির্ভর মানুষের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়। নোনা পানি, ক্ষতিগ্রস্ত জমি, অনিশ্চিত আয়, অসুস্থতা ও সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর মধ্যেই তারা এর প্রভাব অনুভব করছেন।

উপকূলীয় মানুষের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় অভিঘাত পড়ছে কৃষিতে। নদী ও জলোচ্ছ্বাসের লবণ পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় অনেক এলাকায় মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে আগের মতো ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কৃষকদের কেউ কেউ লবণসহিষ্ণু ধানের জাত ও অভিযোজনযোগ্য ফসল চাষের চেষ্টা করছেন। তবে জমির লবণাক্ততা, সেচের পানির সংকট এবং মৎস্যঘেরে লবণ পানি প্রবেশের অভিযোগ সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বাগেরহাট ও রামপালের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও মৎস্যঘের সম্প্রসারণের কারণে কৃষিজমিতে লবণ পানি প্রবেশ করছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় খালে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ রাখার অভিযোগও রয়েছে।

তবে কৃষিজমিতে লবণ পানি প্রবেশ ও পানি প্রবাহ বন্ধের এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও মৎস্যচাষিদের বক্তব্যের মাধ্যমে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ উপকূলে কৃষি ও মৎস্য—দুই খাতই মানুষের গুরুত্বপূর্ণ জীবিকার উৎস।

উপকূলের মানুষের সংকট শুধু জমি বা জীবিকায় সীমাবদ্ধ নয়। অনেক এলাকায় নিরাপদ খাবার পানির উৎসও সীমিত হয়ে পড়েছে। পুকুর, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বাড়ায় সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে দূরে যেতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নারীদের ওপর। অনেক নারীকে প্রতিদিন দূরবর্তী উৎস থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে ত্বকের সমস্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকলে পুকুরসহ মিঠা পানির উৎসগুলোও দূষিত হয়ে যায়। তখন নিরাপদ পানি সংগ্রহই হয়ে ওঠে পরিবারের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।

উপকূলের মানুষের কাছে সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস ও রিমাল শুধু ঘূর্ণিঝড়ের নাম নয়। প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাঙা ঘর, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, নোনা পানি, নষ্ট ফসল, হারানো গবাদিপশু এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ।

একটি দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি দুর্যোগ আঘাত হানলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আরও সংকুচিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি যুক্ত হয়ে উপকূলীয় মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে সুন্দরবনের বিস্তৃতি প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার; এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার।

এই বন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার চাপ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙনসহ জলবায়ুজনিত নানা ঝুঁকি সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।

জীবিকার অনিশ্চয়তা অনেক পরিবারকে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য করছে। কেউ কাজের সন্ধানে শহরে, কেউ অন্য জেলায় পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু নতুন জায়গায় গিয়ে স্থায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলছে না সবার।

কাজের আশায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে ফিরে আসার ঘটনাও রয়েছে। ফলে অনেকের কাছে নিজের ভিটেমাটিই শেষ আশ্রয় হয়ে থাকছে।

এই বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত শুধু পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে অভিবাসন, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্থানান্তরের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মাত্রার ওপর উপকূলীয় ঝুঁকির পরিমাণও নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনের জন্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে পরিকল্পনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ নীতিমালা বা প্রকল্পের সুফল শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে সেই পরিবারটির কাছে, যে পরিবার প্রতিদিন নোনা পানি, নদীভাঙন ও অনিশ্চিত জীবিকার সঙ্গে লড়াই করছে।

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জেলে মাছ ধরেন, মৌয়াল মধু সংগ্রহ করেন, বাওয়ালি বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করেন। অসংখ্য পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বন ও এর জলাভূমির সঙ্গে যুক্ত।

দুর্যোগের সময় সুন্দরবন প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বলয়ের অংশ হিসেবেও কাজ করে। তাই সুন্দরবন রক্ষা মানে শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, কুমির কিংবা পাখিকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলের মানুষের ভবিষ্যৎও।

উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়ার পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা ও স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে তার বাস্তবায়ন।

লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণ, কৃষকদের মানসম্মত বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা, নদী-খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি।

পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির আধার ও কমিউনিটি রিজার্ভার তৈরি, পুকুর পুনঃখনন এবং ঘরে ঘরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।

কৃষির পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মৎস্যসম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলে পরিবারগুলোর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে সুন্দরবনের ওপর অতিরিক্ত চাপও কমানো সম্ভব।

ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য উঁচু ভিত্তির ঘর, পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার, দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা ও কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা দরকার।

সুন্দরবন উপকূলের মানুষের গল্প বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। ঘর হারিয়েছেন, জমি হারিয়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন—তবুও ফিরে এসেছেন নিজের ভিটায়।

কিন্তু শুধু টিকে থাকাই কি তাদের ভবিতব্য?

যে পরিবার বছরের পর বছর নোনা পানির সঙ্গে লড়াই করে, তাদের শুধু খাদ্য সহায়তা নয়—প্রয়োজন নিরাপদ পানি, চিকিৎসা, কৃষির সুযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান ও দুর্যোগের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা।

সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে উপকূলের মানুষের জন্য, আবার উপকূলের মানুষকেও বাঁচাতে হবে সুন্দরবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। বন ও মানুষ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; তারা একই প্রতিবেশব্যবস্থার অংশ।

আজ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের উপকূল—নোনা পানির অনিশ্চিত জনপদ, নাকি নিরাপদ ও টেকসই এক জীবনব্যবস্থা।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: