একদিকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার কাছে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, অন্যদিকে থানার সামনে ফাঁকা বাসে আগুন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠনের ঝটিকা মিছিল এবং একই সময়ে রাজধানীর আরেক প্রান্তে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের গোপন বৈঠকের খবর। সব মিলিয়ে গত শুক্রবার দিনভর রাজধানীর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন করে চাপে ফেলেছে ধারাবাহিক এসব ঘটনা। পরদিন শনিবার নাশকতা ঠেকাতে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, প্রবেশ ও বহির্গমনপথে দুই শতাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি ও টহল জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে শুক্রবারের ঘটনাগুলোর নেপথ্যে একই কোনো গোষ্ঠী রয়েছে কি না, কিংবা এগুলো সমন্বিত কোনো পরিকল্পনার অংশ কি না, এ মুহূর্তে তা নিশ্চিত করে বলছে না পুলিশ। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, বিস্ফোরণের ধরন বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। ফলে ‘নেপথ্যে কারা’, এই প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের মধ্যেই রয়েছে।
কয়েক ঘণ্টায় সাত এলাকায় ১৪ বিস্ফোরণ : শুক্রবার দুপুর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রাজধানীর মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, মগবাজার ও বিটিভি ভবনের সামনের এলাকায় মোট ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া তথ্যের মধ্যে স্থান ও বিস্ফোরণের সংখ্যা নিয়ে কিছু সংবাদমাধ্যমে পার্থক্য থাকলেও, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, এ বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনে মিল রয়েছে।
দুপুরে জুমার নামাজের পর মালিবাগ রেলগেট এলাকায় পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পরে সন্ধ্যার দিকে মহাখালী ও আগারগাঁও এলাকায় বিস্ফোরণের খবর আসে। যাত্রাবাড়ী থানার সামনেও একাধিক হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ইবাদুর রহমান নামে এক রিকশাচালক আহত হন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাত ৮টার দিকে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে একটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় কোতয়ালি থানা পুলিশ। পরে রাত সোয়া ৯টার দিকে মগবাজার মোড় জামে মসজিদের পাশে বিস্ফোরণ ঘটে। রাত ১১টার দিকে বিটিভির প্রধান ফটকের বিপরীত পাশের সড়কেও বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া যায়।
বিস্ফোরণের পর বাসে আগুন : বিস্ফোরণের ধারাবাহিকতার মধ্যেই রাত ১০টা ১৪ মিনিটে কাফরুল থানার সামনে ‘মিরপুর সুপার লিংক’ নামে একটি বাসে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তাৎক্ষণিকভাবে আগুনের কারণ বা কারা এতে জড়িত, তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। এদিন ঢাকার বাইরেও বাসে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর সদর উপজেলার করিমপুর হাইওয়ে থানার পাশে পুলিশের হেফাজতে থাকা পূর্বাশা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
একই দিনে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘটনাগুলোর বিস্তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে থানার সামনে, রেলগেট, ব্যস্ত মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে বিস্ফোরণের ঘটনা দেখাচ্ছে, দুর্বৃত্তরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে স্বল্প সময়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার কৌশল ব্যবহার করছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে।
২০০-এর বেশি চেকপোস্ট, নজর মোটরসাইকেলে : শুক্রবারের ঘটনাগুলোর পর শনিবার রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানিয়েছেন, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, ফ্লাইওভার এবং প্রবেশপথসহ ২০০-এর বেশি স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। নিয়মিত চেকপোস্ট ও টহলের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানোর কথাও জানিয়েছে পুলিশ। কোনো কোনো প্রতিবেদনে চেকপোস্টের সংখ্যা প্রায় আড়াই শতাধিক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযানে ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৪৭টি মামলা দায়েরের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। ডিএমপির ভাষ্য, অবৈধ মোটরসাইকেল ব্যবহার করে নাশকতা বা অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঠেকানো এবং রাজধানীতে সন্দেহজনক চলাচল শনাক্ত করাই বাড়তি নজরদারির অন্যতম লক্ষ্য।
একই দিনে জেএমবি সন্দেহে ২৩ জন আটক : শুক্রবারের ঘটনাপ্রবাহে আরেকটি বিষয়ও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফার্মগেটের তেজগাঁও কলেজ জামে মসজিদে গোপন বৈঠকের সময় জঙ্গি তৎপরতার সন্দেহে ২৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাদের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা বলা হলেও যাচাই-বাছাই চলছে। এই ঘটনার সঙ্গে শুক্রবারের ককটেল বিস্ফোরণের কোনো যোগসূত্র রয়েছে, এমন তথ্য এখনো পুলিশ প্রকাশ করেনি। ফলে দুটি ঘটনাকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে একই দিনে রাজধানীতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্দেহভাজন জঙ্গি তৎপরতার পৃথক তথ্য সামনে আসায় সামগ্রিক নিরাপত্তা নজরদারির গুরুত্ব বেড়েছে।
গুলশানের ঘটনার রেশ কাটেনি : এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই মিছিলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন জড়ো হয়েছিল এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে পুলিশের দিকে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে ঘটনাটিতে শনিবার পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার পর গুলশান মডেল থানার ওসি মো. দাউদ হোসেন এবং গুলশান বিভাগের ডিসি তানভীরকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের আগাম তথ্য সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর আগে ১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১২২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে গোয়েন্দা সমন্বয় নিয়ে : রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা ইউনিট ছাড়াও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আকস্মিক ঝটিকা মিছিল কিংবা কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনায় সেই তথ্য মাঠপর্যায়ে কতটা দ্রুত পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কোনো ঘটনা ঘটার পর অভিযান চালানো দিয়ে নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। সম্ভাব্য জমায়েত বা নাশকতার আগাম তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় সোর্স নেটওয়ার্ক সক্রিয় রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য তথ্য পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক চলাচল শনাক্ত এবং বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান-সবগুলো ধাপ কার্যকর থাকা প্রয়োজন।
গুলশানের ঘটনার পর পুলিশও গোয়েন্দা সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু একটি থানার ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট সব গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করতে হবে।
‘নেপথ্যে কারা’ উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা : শুক্রবারের বিস্ফোরণগুলোর ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। পুলিশও কাউকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করেনি। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি, অপরাধীচক্র, নাশকতাকারী কোনো গোষ্ঠী কিংবা অন্য কোনো পক্ষ, কোনটি এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
তদন্তকারীদের সামনে এখন কয়েকটি প্রশ্ন, একই দিনে এতগুলো জায়গা কেন বেছে নেওয়া হলো, বিস্ফোরণগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল কি না, কারা ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল, কীভাবে তারা দ্রুত সরে গেছে এবং এসব ঘটনায় কোনো অভিন্ন যোগাযোগ বা অর্থায়নের যোগসূত্র আছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং উদ্ধার হওয়া আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, শুক্রবারের ঘটনাগুলোর পর রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। দুই শতাধিক চেকপোস্ট, বাড়তি টহল এবং প্রবেশ-বহির্গমনপথে তল্লাশি চলছে। ফলে এখন বড় প্রশ্ন শুধু শুক্রবারের বিস্ফোরণের রহস্য উদ্ঘাটন নয়, আগাম সতর্কতার মাধ্যমে পরবর্তী কোনো ঘটনা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে, সেটিও।