পানিতে টইটম্বুর কুমার নদ। নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল, পানিতে সারি সারি নৌকা আর মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার আঘাতে মুখরিত চারপাশ। ঢাক-ঢোলসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে উৎসবের আমেজে ফিরে এলো গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কুমার নদে আয়োজিত নৌকাবাইচ ঘিরে তৈরি হয় এমনই উৎসবমুখর পরিবেশ।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ভাঙ্গা উপজেলার কুমার নদে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে এ নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ১৭ বছর পর আজ ভাঙ্গার কুমার নদীর পানি লক্ষ মানুষের ঢলে নৌকার তালে তালে উতালা হয়ে উঠেছে। সারা বাংলাদেশের মানুষ আজ ভাঙ্গার এত বড় নৌকাবাইচ দেখে উদ্বুদ্ধ হবে। তারাও গ্রামের লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে নৌকাবাইচ আয়োজনের উদ্যোগ নেবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি ও গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্যকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানো, পিঠা উৎসব, ঘোড়দৌড়সহ বিভিন্ন লোকজ আয়োজন চালু রাখতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম খান বাবুল বলেন, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ অনুষ্ঠান বিগত সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৭ বছর পর এটি আবার চালু করা হয়েছে। এ ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, হাজার বছরের ঐতিহ্য বাংলার সংস্কৃতি আমরা বাঁচিয়ে রাখতে চাই। যুগের পর যুগ পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে এই ঐতিহ্য রেখে যেতে চাই।
নৌকাবাইচ কমিটির সদস্য সচিব ও ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিমসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান সামীমুজ্জামান, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন প্রকৌশল সদস্য রকিবুল ইসলাম তালুকদার, ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন খান পলাশ, জেলা পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মাদ মিয়াজী এবং ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান।
সকাল থেকেই কুমার নদীর দুই পাড়ে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। দূর-দূরান্ত থেকে শত শত ট্রলার ও নৌকা নিয়ে নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে দর্শনার্থীরা নৌকাবাইচ দেখতে আসেন। নদীর দুই পাড় পরিণত হয় বিশাল জনসমুদ্রে।
এবারের নৌকাবাইচে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাছাড়ি, সাইনদা ও ময়ূরপঙ্খী—এই তিন ধরনের ২৫টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ভাঙ্গা উপজেলা পৌর যুবদলের সভাপতি নাজমুল হাসানের ১ নম্বর নৌকা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১ থেকে ৫ নম্বর পর্যন্ত পাঁচটি নৌকার জন্য পুরস্কার হিসেবে ফ্রিজ দেওয়া হয়। এছাড়া অংশগ্রহণকারী প্রতিটি নৌকার দলকে একটি করে টেলিভিশন পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।