বর্ষার ভরা মৌসুমেও মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের পদ্মায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। নদীতে জাল ফেলেও প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শত শত জেলে। কেউ ঋণের বোঝা সামলাতে পারছেন না, আবার কেউ মাছ ধরার পেশা ছেড়ে জীবিকার জন্য রিকশা চালাচ্ছেন।
একসময় পদ্মার জলে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠত। মৌসুমে নদীপাড়ের ঘাটগুলো সরগরম থাকত জেলেদের ব্যস্ততায়। কিন্তু সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জেলেদের আয়ও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানেও পদ্মায় ইলিশ কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়ায় ৬২২ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন বা ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
জেলেরা বলছেন, নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় নৌকা ও জাল নিয়ে আগের মতো নদীতে গিয়ে লাভ হচ্ছে না। অনেকেই সংসার চালাতে কৃষিকাজ কিংবা অন্য পেশার ওপর নির্ভর করছেন।
হরিরামপুরের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক ব্যাপারী বলেন, আগে মাছ ধরেই সংসার চলত। এখন নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরতে হচ্ছে। শুধু মাছ ধরে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
হারুকান্দি ইউনিয়নের ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লার ভাষ্য, নদীর গভীরতা কমে যাওয়ার কারণে আগের মতো ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি জাহাজ চলাচলের শব্দও মাছের বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
দড়িকান্দি গ্রামের কার্ডধারী জেলে লিটন বলেন, নদীতে ইলিশ না পাওয়ায় তিনি নৌকা ও জাল বিক্রি করে রিকশা কিনেছেন। এখন রিকশা চালিয়েই সংসার চালাতে হচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমে চর ও ডুবোচর তৈরি, পানিদূষণ, খাদ্যের সংকট, মিঠাপানির প্রবাহে পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় ইলিশের বিচরণ ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে। এর পাশাপাশি নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারিতে জাটকা ও মা ইলিশ ধরার কারণেও ইলিশের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ইলিশ রক্ষায় জেলায় ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ৩ মেট্রিক টন ইলিশ ও ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়। নিয়মিত মামলা হয়েছে ১০৯টি, কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৭০ জনকে এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২ লাখ টাকা।
হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, প্রাকৃতিক বিভিন্ন কারণে ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হতে পারে। নদীতে চর সৃষ্টি, খাদ্য কমে যাওয়া, জাহাজ চলাচল ও দূষণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মা ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ ধরার বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ, মানুষের অসচেতনতা এবং নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ শিকারের কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের পরিমাণ কমেছে।