আজও কাঁদায় কৃষ্ণপুরের সেই ভোর, একসঙ্গে প্রাণ হারান ১৮৬

লাখাই (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা

সারাদেশ

হবিগঞ্জের লাখাইয়ে আজ শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে উপজেলার সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত কৃষ্ণপুর

2026-09-18T15:19:23+00:00
2026-09-18T15:19:23+00:00
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
আজও কাঁদায় কৃষ্ণপুরের সেই ভোর, একসঙ্গে প্রাণ হারান ১৮৬
লাখাই (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:১৯ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
হবিগঞ্জের লাখাইয়ে আজ শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে উপজেলার সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত কৃষ্ণপুর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। এদিন ভোরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১২৭ জন বাঙালি হিন্দুকে হত্যা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় হবিগঞ্জ জেলায় সংঘটিত সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে কৃষ্ণপুরের এই গণহত্যা স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের মরদেহ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে আশপাশের লালচাঁদপুর ও গোকুলনগর এলাকাতেও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

যেভাবে সংঘটিত হয় হত্যাযজ্ঞ

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণপুরে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরিকল্পনা করতে রাজাকাররা কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে জড়ো হয়। পরদিন গভীর রাতে রাজাকারদের একটি দল নৌকা ও স্পিডবোট নিয়ে কৃষ্ণপুরে পৌঁছে গ্রামটি ঘিরে ফেলে।

১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা থেকে ৫টার দিকে অষ্টগ্রাম ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল স্পিডবোট ও কয়েকটি বড় নৌকায় করে কৃষ্ণপুরে আসে। তাদের সঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার রাজাকার-আলবদর সদস্যরাও যোগ দেয়।

গ্রামে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। এ সময় রাজাকাররা গ্রামবাসীর বাড়িঘরে লুটপাট চালায় এবং নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায় বলে স্থানীয়দের বর্ণনায় জানা যায়। পরে বিভিন্ন বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ১৩১ জন হিন্দুকে একত্র করে চক্রাকারে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। এতে ১২৭ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান প্রিয়তোষ রায়, নবদ্বীপ রায় ও হরিদাস রায়। গুরুতর আহত ওই তিনজন পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন। তাঁদের মধ্যে হরিদাস রায় দীর্ঘদিন ধরে সেই দিনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন।

তিন এলাকায় নিহত ১৮৬ জন

কৃষ্ণপুরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী লালচাঁদপুর ও গোকুলনগর গ্রামেও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। লালচাঁদপুরে মধু নমঃশূদ্রের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ৫১ জনকে লুটপাটের পর একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। গোকুলনগরেও একই কায়দায় আটজন হিন্দুকে হত্যা করা হয়।

তিনটি এলাকায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে মোট ১৮৬ জন নিহত হন বলে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা

কৃষ্ণপুর গণহত্যার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া হরিদাস রায় ২০১০ সালের ৪ মার্চ হবিগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রাজাকার লিয়াকত আলীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলা করার পর বাদীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ওই বছরের ৭ জুন লাখাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

পরে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট কৃষ্ণপুর গণহত্যার ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হয়। মামলায় লিয়াকত আলী ও আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও লুটপাটসহ সাতটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মামলার আসামিদের মধ্যে লিয়াকত আলী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এবং আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী পাকিস্তানে অবস্থান করছেন।

কৃষ্ণপুরের মানুষ আজও ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর দিনটি ফিরে আসে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে শোক ও বেদনার স্মৃতি হয়ে।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: