রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিলে নারীদের সামনে রাখা হলেও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব এবং নির্বাচনী মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাঁদের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয় না—এমন অভিযোগ উঠেছে তরুণ নারী সম্মেলনে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে নারীপক্ষ আয়োজিত দুই দিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সম্মেলনে বিএনপির নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও নারীদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হচ্ছে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নারীদের প্রস্তুত করলেই হবে না, পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন।
নারীদের নির্বাচনী মনোনয়নে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অভিজ্ঞতার অজুহাতে নারীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। পুরুষরা অভিজ্ঞতা ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে নারীদের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ থাকা উচিত।
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিলুফার মনি বলেন, ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। তবে পরবর্তীতে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যেতে চাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়।
তিনি বলেন, মিছিল ও আন্দোলনে নারীদের সামনের সারিতে থাকা গ্রহণযোগ্য হলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে যেতে চাওয়াকে অনেক সময় ভিন্নভাবে দেখা হয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর অংশগ্রহণ কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু সমাজে নারীদের সবসময় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নারীদের উপস্থিতি এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে নুসরাত তাবাসসুম বলেন, মিছিলে ব্যানার ধরতে কয়েকজন নারীকে সামনে রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে মনোনয়ন, নেতৃত্ব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জায়গায় তাঁদের অংশগ্রহণ দেখা যায় না।
নারীদের সমান সুযোগের দাবিকে অতিরিক্ত সুবিধা চাওয়ার সঙ্গে তুলনা করারও সমালোচনা করেন তিনি। জন্মের পর থেকেই শিক্ষা, পুষ্টি, বিশ্রাম ও স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর সুযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন নুসরাত।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোতে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো এখনো বিদ্যমান বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ না করার বিষয়েও সমালোচনা করেন তিনি।
সকালে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন নারীপক্ষের সভানেত্রী কে এ জাহান রুমী। সংগঠনের সদস্য মাহীন সুলতান সম্মেলনের উদ্দেশ্য, প্রকল্প পরিচিতি এবং নারী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নারীপক্ষের অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। জুলাই আন্দোলনে তরুণ নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের সম্পৃক্ততা ধরে রাখা যায়নি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং বলেন, তরুণ নারীদের ওপর বিনিয়োগ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে। তরুণ নারী নেতৃত্ব বিকাশে আন্তদলীয় ও আন্তপ্রজন্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে লেখক ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তপতী সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী বীথি ঘোষসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
দুই দিনের সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন পেশার শতাধিক নারী অংশ নিচ্ছেন। জনজীবনে তরুণ নারীদের প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও অবদান নিয়ে তাঁরা মতামত তুলে ধরছেন।
শুক্রবার বিকেলে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।