দেশজুড়ে মৌসুমি জ্বরের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপের পাশাপাশি দেশে নীরবে বাড়ছে টাইফয়েড ও অন্যান্য ভাইরাস জ্বরের সংক্রমণ। বর্ষা ও ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও চিকুনগুনিয়ার পাশাপাশি টাইফয়েড এবং হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি একই সঙ্গে ছড়াচ্ছে। এরই মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্যসেবা যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন ডেঙ্গুকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কোথাও কোথাও টাইফয়েডকে অবহেলা করা হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলে— ডেঙ্গুর লক্ষণের সঙ্গে মিল থাকায় নীরবেই বাড়ছে টাইফয়েড রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। জ্বরের শুরুতে চিকিৎসক ডেঙ্গুর পরীক্ষা দিচ্ছেন, পরে ডেঙ্গু শনাক্ত না হলে করানো হচ্ছে টাইফয়েড পরীক্ষা। পরীক্ষায় শনাক্ত হতে পেরিয়ে যাচ্ছে অনেকটা সময় যা রোগীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘরে ঘরে জ্বর-ঠান্ডা, কাশি, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ জ্বরে আক্রান্ত। অনেকে বুঝতে পারছেন না— এটা কি সাধারণ ভাইরাল ফ্লু, নাকি ডেঙ্গু বা টাইফয়েডের মতো জটিল কোনো সংক্রমণ। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে ইনফ্লুয়েনজা টাইপ-এ, টাইফয়েড, প্যারা-টাইফয়েড এবং ডেঙ্গু-হামের প্রাদুর্ভাব সর্বাধিক। এসব সংক্রামক ব্যাধির সঠিক পার্থক্য নির্ধারণ করা জরুরি, কারণ প্রতিটি রোগের চিকিৎসা ও যত্ন আলাদা। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অবহেলা বিপজ্জনক হতে পারে।
জানা যায়, হাম-ডেঙ্গুর সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড বা ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ। চলতি মাসের শুরুর দিকে বা অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত মৌসুমি জ্বর ও ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে এমনটা জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশীদ। তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু নিয়ে ৩ মাসের ক্যাম্পেইন চালু করেছে সরকার। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ৩০০ চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। রোগী বৃদ্ধির শঙ্কায় বেড, স্যালাইন ও টেস্ট কিট মজুদ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে রাজধানীজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এই স্বাস্থ্য পরিস্থিতি। প্রতিদিন উত্তরা থেকে মেট্রোরেলে যাতায়াতকারী তামনিয়া ইসলাম বলেন, গত শনিবার মেয়েকে নিয়ে মেট্রোরেলে ওঠার পর রাতে মা-মেয়ে দুজনেরই জ্বর আসে। তার জ্বর দুই দিন পর কিছুটা কমলেও, ১০ বছর বয়সী বড় মেয়ে ও চার বছর বয়সী ছোট মেয়ে টানা উচ্চ জ্বরে ভুগছে। ডেঙ্গু নাকি হামে আক্রান্ত হলো— এই আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা। তামনিয়া ইসলামের মতো রাজধানীর হাজার হাজার পরিবার এখন একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও ভয়ে দিনাতিপাত করছে।
গতকাল রাজধানীর প্রধান শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া রোগীর ভিড় লক্ষ করা গেছে। শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে ঘুরে দেখা যায়, ছোট শিশুদের কোলে নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে আছেন উৎকণ্ঠিত বাবা-মায়েরা। কারও বাচ্চার নাক দিয়ে পানি পড়ছে, কারও নিস্তেজ ভাব, আবার কারও চরম শ্বাসকষ্ট বা তীব্র কাশি। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে বহির্বিভাগে প্রতিদিন যেখানে ২০০ থেকে ২৫০ জন শিশু চিকিৎসা নিত, এখন সেই সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে জরুরি ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক রোগী আসছে। এদের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ শিশুকে জটিলতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়েছে জ্বরের কারণে। কারো নাক দিয়ে পানি পড়ছে, কারো কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট রয়েছে। জ্বরে দুর্বল হয়ে অনেক শিশু অভিভাবকের কাঁধে মাথা রেখে আছে। সকাল থেকেই হাসপাতালের পাঁচটি কাউন্টারে চিকিৎসকরা রোগী দেখছিলেন। জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। অন্যদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। পাঁচ বছরের সাধিয়ার মুখ গলা ফুলে আছে, দুদিন ধরে জ্বরের কারণে কিছুই খেতে পারছিল না। অভিভাবকরা ভেবেছিল বাচ্চার টনসিল ফুলেছে। কিন্তু ডাক্তার দেখানোর পর জানতে পারেন শিশুটির সম্ভবত মামস হয়েছে। টেস্ট দিয়েছে, রিপোর্ট এলে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান শিশুর বাবা রহিম শেখ।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গু জ্বরে শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে টাইফয়েড এবং মামস। শিশুদের চোখে পিঁচুটি জমা, গলার টনসিল ফোলা বা জয়েন্টে তীব্র ব্যথাসহ চিকনগুনিয়ার উপসর্গও দেখা যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বরের সঙ্গে শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে শিশুকে অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত। আক্রান্ত শিশুকে অন্যান্য শিশুদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) রাখতে হবে, পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়াতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ খাওয়ানো একদম নিষেধ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর দেশে মৌসুমি জ্বরের প্রকোপ ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর পেছনে আবহাওয়ার পরিবর্তন, মশার অতিরিক্ত ঘনত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ঘাটতি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৫ দিনে ১৩ হাজার ৫৭ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুর পরিসংখ্যানও ঊর্ধ্বমুখী। আগস্ট থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক দ্রুত বাড়ছে। যা আগামী অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত এই প্রকোপ আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগতত্ত্ববিদদের পূর্বাভাস বলছে চলতি বছর ডেঙ্গু আরো বাড়বে। প্রতি চার বছর পর পর ডেঙ্গুর মহামারি ঘটে, ২০২৩ সালে সর্বশেষ ডেঙ্গুর মহামারি হয়েছিল। এ বছরের শেষের দিকে সেটা আবারও হতে পারে। কাজেই আমরা যদি মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগী ব্যবস্থাপনার পলিসি না বদলাই তাহলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খুব একটা উন্নত হবে না। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ অথবা অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিপজ্জনক রূপ নিয়ে সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এই ধাক্কা সামলাতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেছেন, অক্টোবরে ডেঙ্গুর বড় ধাক্কা সামলাতে এখনই নামতে হবে। এই সম্ভাব্য মহামারি ঠেকাতে এখন থেকেই সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থল ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি দেশজুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।