ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন চমক, শরীর না কেটেই টিউমার ধ্বংস করবে শব্দতরঙ্গ!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্বাস্থ্য

ক্যান্সারের চিকিৎসা মানেই অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি কিংবা রেডিয়েশন—এ ধারণায় নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। এবার উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে শরীর

2026-09-12T20:48:40+00:00
2026-09-12T20:48:40+00:00
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
 
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্বাস্থ্য
ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন চমক, শরীর না কেটেই টিউমার ধ্বংস করবে শব্দতরঙ্গ!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ক্যান্সারের চিকিৎসা মানেই অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি কিংবা রেডিয়েশন—এ ধারণায় নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। এবার উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে শরীর না কেটেই ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের পদ্ধতি নিয়ে এগোচ্ছেন গবেষকরা। আলট্রাসাউন্ডভিত্তিক এই প্রযুক্তির অন্যতম সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হলো হিস্টোট্রিপসি।

শরীরের ভেতরের ছবি তৈরিতে আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার বহু পুরোনো। কিন্তু সেই শব্দতরঙ্গকেই এবার চিকিৎসার অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে টিউমার ধ্বংসের পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় করা সম্ভব হতে পারে।

হিস্টোট্রিপসির পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলী জেন জুয়ের গবেষণা।

পিএইচডি শিক্ষার্থী থাকাকালে জু অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগাক্রান্ত টিস্যু ধ্বংসের উপায় খুঁজছিলেন। শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ প্রয়োগ করে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে তিনি অপ্রত্যাশিত ফল পান।

প্রথম দিকে ব্যবহৃত শব্দতরঙ্গের কারণে গবেষণাগারে থাকা অন্যরা বিরক্ত হচ্ছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে জু আলট্রাসাউন্ডের পালসের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। এতে প্রতিটি পালসের দৈর্ঘ্য মাইক্রোসেকেন্ডে নেমে যায় এবং শব্দ মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে চলে যায়।

কিন্তু এর পরই ঘটে বিস্ময়কর ঘটনা।

শব্দের পালস বাড়ানোর পর দেখা যায়, এটি শুধু শ্রবণযোগ্য শব্দের সমস্যা কমায়নি, বরং জীবন্ত টিস্যু ভাঙার ক্ষেত্রেও আরও কার্যকর হয়েছে। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে একটি গর্ত তৈরি হতে দেখেন জু।

সেই ঘটনাচক্রের আবিষ্কারই পরবর্তী সময়ে হিস্টোট্রিপসি প্রযুক্তির ভিত্তি হয়ে ওঠে।

কীভাবে টিউমার ধ্বংস করে শব্দতরঙ্গ?

হিস্টোট্রিপসিতে উচ্চ ক্ষমতার আলট্রাসাউন্ড খুব নির্দিষ্ট জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা হয়। এরপর অত্যন্ত দ্রুত ছোট ছোট পালস আকারে শব্দতরঙ্গ প্রয়োগ করা হয় টিউমারের ওপর।

এই পালস টিউমারের ভেতরে অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোবাবল তৈরি করে। সেগুলো কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে ফুলে ওঠে এবং আবার চুপসে যায়। এই প্রক্রিয়া বারবার ঘটার ফলে টিউমারের টিস্যু যান্ত্রিকভাবে ভেঙে যায়।

পরে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ওই ভাঙা টিস্যুর অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার করে ফেলে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ প্রক্রিয়ায় টিউমার ধ্বংস করতে সরাসরি শরীর কাটার প্রয়োজন হয় না।

যকৃতের ক্যান্সারে ইতোমধ্যে অনুমোদন

হিস্টোট্রিপসি এখন আর শুধু গবেষণাগারের পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন যকৃতের টিউমারের চিকিৎসায় এ প্রযুক্তির অনুমোদন দেয়।

এর পর একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, যকৃতের টিউমারের প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি প্রযুক্তিগতভাবে সফল হয়েছে। পেটে ব্যথা কিংবা শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তবে গবেষণায় এসব জটিলতা তুলনামূলকভাবে বিরল এবং পদ্ধতিটি সাধারণভাবে নিরাপদ বলে উঠে এসেছে।

চলতি বছরের জুনে যুক্তরাজ্যও ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে হিস্টোট্রিপসির অনুমোদন দিয়েছে। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় এ চিকিৎসা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এক থেকে তিন ঘণ্টাতেই চিকিৎসা

গবেষকদের মতে, হিস্টোট্রিপসি তুলনামূলক দ্রুত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। চিকিৎসার সময় রোগীর অবস্থান ও টিউমারের ধরন অনুযায়ী সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া এক থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা সম্ভব।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে একবারের চিকিৎসাতেই টিউমার ধ্বংস করা যায়। তবে টিউমার বড় হলে কিংবা একাধিক টিউমার থাকলে একাধিক সেশন প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসা শেষে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী একই দিন বাড়ি ফিরতে পারেন।

সব ক্যান্সারে এখনো ব্যবহারযোগ্য নয়

তবে হিস্টোট্রিপসিকে এখনই সব ধরনের ক্যান্সারের সমাধান হিসেবে দেখছেন না গবেষকরা। দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসার পর ক্যান্সার আবার ফিরে আসার ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া টিউমার ভেঙে দেওয়ার পর ক্যান্সারের কোষ শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়বে কি না—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। তবে প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় এখন পর্যন্ত এ ধরনের আশঙ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শরীরের সব জায়গায় হিস্টোট্রিপসি ব্যবহার করাও সম্ভব নয়। হাড় আলট্রাসাউন্ডের পথ আটকে দিতে পারে। আবার ফুসফুসের মতো গ্যাসপূর্ণ অঙ্গে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আশপাশের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তবে কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের টিউমারের চিকিৎসায় এর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

টিউমার ‘পুড়িয়ে’ ফেলছে আরেক প্রযুক্তি

আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ক্যান্সারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসিই একমাত্র পদ্ধতি নয়। আগে থেকেই হাই-ইনটেনসিটি ফোকাসড আলট্রাসাউন্ড বা HIFU প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে।

হিস্টোট্রিপসির মতো টিস্যু যান্ত্রিকভাবে ভেঙে ফেলার বদলে HIFU টিউমারের নির্দিষ্ট অংশে শব্দের শক্তি কেন্দ্রীভূত করে তাপ তৈরি করে। সেই তাপে টিউমারের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।

গবেষকরা বিষয়টিকে আতশকাচ দিয়ে শুকনো পাতায় সূর্যের আলো কেন্দ্রীভূত করার সঙ্গে তুলনা করেন। পার্থক্য হলো, এখানে আলোর বদলে শব্দের শক্তি ব্যবহার করা হয়।

HIFU-এরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাড় ও গ্যাস আলট্রাসাউন্ডের পথ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়া কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি উপযোগী নয়। তবে স্তন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে এর ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে।

শব্দতরঙ্গে জাগতে পারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের পাশাপাশি আলট্রাসাউন্ডের আরেকটি সম্ভাবনা নিয়ে এখন গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা—ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে এর সমন্বয়।

গবেষকদের ধারণা, আলট্রাসাউন্ড দিয়ে টিউমার ক্ষতিগ্রস্ত করলে সেটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। ফলে ইমিউন সিস্টেম ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করে আক্রমণ করার সুযোগ পেতে পারে।

এ ধারণা সফল হলে একটি টিউমারে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগের পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অন্য জায়গায় থাকা একই ধরনের ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধেও সক্রিয় হতে পারে—এমন সম্ভাবনা দেখছেন গবেষকরা।

তবে এটি এখনো মূলত গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। মানুষের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন।

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত?

ক্যান্সারের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন বহুদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু এসব চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও শারীরিক ধকল কমানোর উপায় খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।

সেই জায়গায় আলট্রাসাউন্ডভিত্তিক চিকিৎসা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। শরীর না কেটে টিউমার ধ্বংস করা, আশপাশের সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি কমানো এবং একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে প্রযুক্তিটি নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগ্রহ বাড়ছে।

তবে গবেষকরাও সতর্ক। হিস্টোট্রিপসি বা অন্য কোনো আলট্রাসাউন্ডভিত্তিক পদ্ধতিকে এখনো ক্যান্সারের ‘জাদুর চিকিৎসা’ বলা যাচ্ছে না। এর কার্যকারিতা, দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল ও সীমাবদ্ধতা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তবু কয়েক দশক আগে একটি গবেষণাগারে সহকর্মীদের বিরক্তিকর শব্দ কমানোর চেষ্টা থেকে যে আবিষ্কারের সূচনা, সেটিই হয়তো ভবিষ্যতে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার কষ্ট অনেকটাই কমানোর পথ দেখাতে পারে।


Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: