বৃষ্টির পানি জমে বাড়ছে ডেঙ্গু, বড় ঢেউয়ের শঙ্কা ৩ বিভাগে

কেএম শরিফ ইমতিয়াজ

স্বাস্থ্য

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার ব্যাপক বংশবিস্তারের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর

2026-09-07T12:38:54+00:00
2026-09-07T12:38:54+00:00
  সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
 
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্বাস্থ্য
ঝুঁকি বাড়িয়েছে দুই সেরোটাইপের মিশ্রণ
বৃষ্টির পানি জমে বাড়ছে ডেঙ্গু, বড় ঢেউয়ের শঙ্কা ৩ বিভাগে
কেএম শরিফ ইমতিয়াজ
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম 
ফাইল ছবি
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার ব্যাপক বংশবিস্তারের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগ। অধিকাংশ জেলায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি থাকায় আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। দেশে ইতোমধ্যে ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হয়েছে। টানা বর্ষণের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। তীব্র জ্বর, শরীরব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। পরীক্ষায় তাদের অধিকাংশেরই ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এসময় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে সর্বোচ্চসংখ্যক রোগী ভর্তি হওয়ার নতুন রেকর্ড হয়েছে।

ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় ঢাকা বিভাগে। সংক্রমণের দিক থেকেও ঢাকা পিছিয়ে নেই। গত বছরও দেশের কয়েকটি বিভাগে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল বরিশাল বিভাগ এবং সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। চলতি বছরও পরিসংখ্যান একই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে, আর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা মশাবাহিত রোগীর সংখ্যা। এলাকায় চিকিৎসা সেবা মানসম্পন্ন না হওয়ায় ঢাকায় ছুটছেন তারা। এরই মধ্যে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গতকাল রোববার দুপুরে সচিবালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়ার বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশও দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করে সারাদেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।

জানা যায়, দেশে প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং এতে মৃত্যু বাড়ছে। মে মাসে যত সংক্রমণ ছিল, জুনে তার তিন গুণ সংক্রমণ হয়েছে। আবার জুলাইয়ের সংক্রমণ জুন মাসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। এ সময় মৃত্যুও বেড়েছে তিন গুণের কাছাকাছি। গত আগস্ট মাসে তার আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি সংক্রমণ হয়েছে, বেড়েছে মৃত্যুও। এরই মধ্যে এবার ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ ধরনটি প্রধান হয়ে উঠেছে। তবে ডেন-২ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছড়াচ্ছে। কোথাও ডেন-৩, আবার কোনো কোনো এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে ডেন-২ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এই পরিস্থিতিকে বলছে ‘মিশ্র চিত্র’। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, একই সময়ে দুই ধরনের সেরোটাইপের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবারের দ্রুত সংক্রমণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। হাসপাতালে রোগী বাড়লেও রাজধানীতে শয্যা পাওয়ার জন্য ঘুরতে হচ্ছে অনেককে। এ চিত্র শুধু ঢাকার নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেরও। ঢাকার বাইরে এবার রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে আবার মশানিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসাও অপর্যাপ্ত।

রাজধানীর ফার্মগেটে একটি বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গতকাল সকালে কমপক্ষে ১৭ জন মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। তাদের একজন খালেদা আক্তার। সঙ্গে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ২২ বছর বয়সী ছেলে ফাতেমি। দুটি সরকারি হাসপাতালে গিয়েও ছেলের জন্য শয্যা পাননি বলে জানান তিনি। বেসরকারি এই হাসপাতালের পুরুষ রোগীদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি শয্যার একটিও তখন খালি ছিল না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের অপেক্ষা করতে বলেছিল। একটি কেবিন খালি ছিল, দৈনিক ভাড়া আট হাজার টাকা। বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক খালেদা আক্তারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। তবু শেষ পর্যন্ত কেবিন নেওয়ার কথাই ভাবছিলেন। খালেদা আক্তার বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কেবিনটাই নিতে হবে। ছেলের জীবন আগে। তিন দিনে অনেক টাকা গেছে। আরও হয়তো যাবে। উপায় নেই।’

জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদেরা বলছেন, চলতি মাসে ডেঙ্গু অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে। বছরের চলতি সময়ে আবারও ২০২৩ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। হাসপাতালে রোগী বাড়লেও রাজধানীতে শয্যা পাওয়ার জন্য ঘুরতে হচ্ছে অনেককে। এ চিত্র শুধু ঢাকার নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেরও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, ‘সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব আমাদের না। চিকিৎসার বিষয়ে বলতে পারি, সরকারি হাসপাতালে সব সময়ই রোগীর চেয়ে শয্যা কম থাকে। এটা নতুন কিছু নয়, তবে চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা তিন গুণের বেশি বেড়ে হয় ৯ হাজার ২০৬। আগস্টে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, যা জুনের তিন গুণের বেশি এবং জুলাইয়ের দ্বিগুণের বেশি। সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেও রোগী বাড়ার গতি কমেনি। এ বছরে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৪৪ জন, মৃত্যু হয়েছে ১১১ জনের। গত বছরের একই সময়, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছিলেন ৩৩ হাজার ৩০৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৩০ জনের। ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৩২৫ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৯৯ জনের। সরকারি হিসাবটি মূলত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর। মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে থাকা বা হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীরা এই হিসাবে নেই।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, গত জুনে চট্রগ্রামের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি—এই তিন জেলায় নমুনা জরিপ করা হয়েছিল। বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি শহরাঞ্চলে ডেন-৩ প্রধানত পাওয়া গেছে; কিন্তু একই দুই জেলার গ্রামাঞ্চলে ডেন-২ ছিল প্রধান। আবার বান্দরবানে ডেন-২-তে আক্রান্ত রোগীই বেশি পাওয়া গেছে। কাজী আহমেদ জাকী বলেন, সার্বিকভাবে এবার ডেন-৩ বেশি। তবে ডেন-২ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আছে। ফলে এবার একটি মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।



Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: