বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়: গরিবের বিনামূল্যের ওষুধ কেবল নামেই

এসএম শামসুজ্জোহা

স্বাস্থ্য

সরকারি হাসপাতালে গরিবের বিনামূল্যের ওষুধ কেবল নামেই -এই একটি লাইনে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার এক নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।

2026-09-03T19:07:13+00:00
2026-09-03T19:07:43+00:00
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্বাস্থ্য
বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়: গরিবের বিনামূল্যের ওষুধ কেবল নামেই
সরকারি চিকিৎসা নিতে আসা ৬৯.৩৪ শতাংশ রোগীকে নিজস্ব ব্যয়ে ওষুধ কিনতে হয়
এসএম শামসুজ্জোহা
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৭ পিএম  আপডেট: ০৩.০৯.২০২৬ ৭:০৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
সরকারি হাসপাতালে গরিবের বিনামূল্যের ওষুধ কেবল নামেই -এই একটি লাইনে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার এক নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। কাগজ-কলমে বা সরকারি প্রচারণায় যে ওষুধগুলোকে গরিবের বন্ধু বা বিনামূল্যের বলা হয়, বাস্তবে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।  রোগীদের ক্ষোভ ও বাস্তবতা বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতের একটি অন্যতম বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশের দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা সরকারি হাসপাতাল, যেখানে সরকারিভাবে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে রোগীরা হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধের একটি বড় অংশই পান না। প্রায়ই তাদের খালি হাতে কিংবা কেবল নামমাত্র কিছু ওষুধ নিয়ে ফিরতে হয়।

দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগের ঔষধ বিতরণ কেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ লাইন। অনেকের হাতে শুধু প্যারাসিটামল, সালবিটামল, ক্লোরোফিরামিন, জিংক, এগুলো দেওয়া হয়।  মাঝে মধ্যে আবার অন্য কয়েক আইটেম দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহির থেকে কেনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বহির্বিভাগের সামনে উপস্থিত একাধিক রোগীরা অভিযোগ করেন, পরিচিত লোকজন, এবং মুখ-চেনা মানুষদের বেশি ও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ গুলো দেওয়া হয়। এছাড়াও হাসপাতালের আশপাশের বহিরাগতরা ভিতরে ঢুকে ওষুধ নিয়ে যায়। প্যারাসিটামল, জিংক, সিটরিজিন, এমন কয়টা দিয়ে বাকি গুলো নেই বলে বলা হচ্ছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য মন্টিলোকাস্ট ও গ্যাসের প্যান্টোপ্রাজল, স্যালাইন, এন্টিবায়োটিক গ্রুপের ওষুধগুলো দেওয়া হয় না তেমন একটা।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, সরকারি তালিকায় ৪৭ পদের ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন ইউনিটে ১০ থেকে ১৫ পদের বেশি ওষুধ পৌঁছায় না। ফলে রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এদিকে ওয়ার্ড ক্লিনিকগুলোও দীর্ঘদিন ওষুধ সংকটে ছিল। ছয় মাস পর চলতি মাসে প্রতিটি ক্লিনিকে মাত্র এক বাক্স করে ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ বলেন, ‘এনসিডি কর্নার অপারেশন প্ল্যানের আওতায় চলত কিন্তু সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফান্ডের সংকট দেখা দিয়েছে। এখন এই ওষুধ কেনার জন্য অন্য কোথাও থেকে অর্থ দেওয়ারও সুযোগ নেই। চলতি বাজেটের পরে হাসপাতালের ফান্ড বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন হাসপাতালগুলো তাদের প্রয়োজন মতো এসব ওষুধ কিনতে পারবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথ্যে জানা গেছে, প্রযাপ্ত বাজেটের অভাব। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যার তুলনায় ওষুধের বরাদ্দ অনেক কম। বিনামূল্যের ওষুধের তালিকা সীমিত হওয়ায় সরকারিভাবে মাত্র কয়েকটি সাধারণ ওষুধ (যেমন: প্যারাসিটামল বা অ্যান্টাসিড) বিনামূল্যে দেওয়া হয়। জীবনরক্ষাকারী বা দামি ওষুধ এই তালিকায় থাকে না। হাসপাতালের ভেতরে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে বিনামূল্যে দেওয়ার ওষুধ বাইরে পাচার বা কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধ লেখেন, তার বেশির ভাগই হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে নেই বলে দেওয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে দরিদ্র রোগীদের বাইরের দোকান থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে হয়। আবার রয়েছে দালাল ও চক্রের দৌরাত্ম্য। হাসপাতালের আশেপাশে গড়ে ওঠা দালাল চক্র রোগীদের নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়। ওষুধ নীতিতে কাঠামোগত দুর্বলতা ও তদারকির অভাবে ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে মনিটরিং বা তদারকি করা হয় না। ত্রুটি রয়েছে সাপ্লাই চেইনেও। সময়মতো ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে হাসপাতালে ওষুধ না পৌঁছানো বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়। 

দরিদ্র পরিবারের গ্যাসট্রিক ও আলসার রোগী রহিমা বেগম (৬০)। তিন সপ্তাহ ধরে আসছেন সরকারি মুগদা হাসপাতালে ফ্রি ঔষধ নিতে। প্রতিবার তাকে জানানো হয়েছে ওষুধ নেই। সরকারি ওষুধই তার একমাত্র ভরসা। ওষুধ না পেয়ে চোখেমুখে হতাশার ছাপ। রহিমার মতো এমন অনেক রোগীরাই ২০-২৫ দিন ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। বিশেষ করে সংক্রামণ জনিত আক্রান্ত রোগীরা অধিক সমস্যায় আছেন। দ্রুত সংকটের সমাধান চান ভুক্তভোগীরা। সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা আরেক রোগী আমিনুল হক জানান, ওষুধ নিতে আসছি কিন্তু বলা হচ্ছে ওষুধ নেই। অনেকদিন ধরে ওষুধ পাচ্ছি না। সঠিকভাবে বণ্টন হয় না, বড়লোকের পেটে যাচ্ছে গরিবের ওষুধ। গত তিন দিনে হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য রোগীদের ভিড়, প্রায় সবার মখেই হতাশার ছাপ। অতি প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ওষুধগুলোর চরম সংকট। হাসপাতালের ওষুধ বিতরণ কেন্দ্রের একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স নাদিরা। তিনি জানান, ‘লোসারটিন, গ্লিকাজাইড, মেটফরমিন, লোসারটিম ৫০ প্লাস ওষুধগুলো নেই। ওষুধগুলোর চাহিদা ও রোগী বেশি। কিন্তু চাহিদামতো দেওয়া যাচ্ছে না।’ 

সরকারের সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিন বলছে, দেশে সংক্রামক রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমলেও উল্টো অসংক্রামক রোগের চিত্র। মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশই হচ্ছে অসংক্রামক রোগে। যার ৩৪ ভাগই ঘটে হৃদরোগে। এ হৃদরোগের বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার রোগীদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। এ দুটি রোগের কারণে হৃদরোগ, কিডনি, ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁঁকি বাড়ায়। তথ্যমতে, স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বেশি- এমন দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক উপর দিকে। সরকারি হিসেবে স্বাস্থ্যে ১০০ টাকা ব্যয় হলে রোগীর পকেট থেকে যায় ৭০ টাকা। এর মধ্যে ৬৫ টাকা ব্যয় হয় শুধু ওষুধের পেছনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য ব্যয়ে সরকারের অংশ ক্রমান্বয়ে কমে রোগীর খরচ বেড়েছে। এ জন্য সাশ্রয়ের জন্য বেশিরভাগ মানুষ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়ায় সরাসরি দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের ওষুধ বিতরণের অবস্থা একটি জরিপে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৬৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ রোগীকে বাহির থেকে নিজস্ব ব্যয়ে ওষুধ কিনতে হয়। 

চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে প্রতিবছর দেশের ৫০ লাখের বেশি মানুষ গরিব হচ্ছেন জানিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে আর্থিক চাপের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। বেশিরভাগ মানুষ চক্রবৃদ্ধি সুদের উপর বা ধার করে টাকা নিয়ে চিকিৎসা করেন। পরে তাদেরকে টাকা শোধ করতে হয় নিজেদের জমি-জমা বা সম্পত্তি বিক্রি করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা। সেইসঙ্গে প্রচুর রোগী রয়েছে। এখানে চাইলেই রিসার্চ করা যায়। অনেক উন্নত দেশ আছে আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু রোগী কম। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিত্র আলাদা এখানে রোগী সংখ্যার কোনো অভাব নেই, তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতার অভাবই এই সমস্যা আরও জটিল করে তুলছে।’




Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: