কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের নানা অভিযোগ শুনেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এমপি। এ সময় ডিউটিতে অনুপস্থিত এক ফার্মাসিস্টকে তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে হাসপাতালে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কোনো ধরনের পূর্ববার্তা না থাকায় তার আকস্মিক উপস্থিতিতে হাসপাতালজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

পরিদর্শনের শুরুতে মন্ত্রী হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, সার্জারি বিভাগ, বহির্বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ডিসপেনসারি ঘুরে দেখেন। চিকিৎসক-নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বাস্তব চিত্রও সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
এ সময় চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাকে কাছে পেয়ে এক শিশুর নারী অভিভাবকসহ কয়েকজন রোগীর স্বজন হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান, ওষুধ, ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন ভোগান্তি ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে অভিযোগ করেন।
মন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং রোগীদের যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে হাসপাতালের ডিসপেনসারিতে গিয়ে ফার্মাসিস্ট রিগান হোসেনকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত দেখতে পান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ছুটি ছাড়াই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানতে পারেন মন্ত্রী।
বিষয়টি জানার পর অসন্তোষ প্রকাশ করে তাকে তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশ দেন তিনি। পরে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক ও আন্তরিক হওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখার সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিম্নমান নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য জেলার হাসপাতালের তুলনায় হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অবস্থা খারাপ। রোগীদের স্বাভাবিক চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা কম—পরিদর্শনকালে বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নজরে আনা হয়। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, ইতোমধ্যে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঁচজন চিকিৎসক পদায়ন করা হয়েছে। তারা যোগদানের পর প্রয়োজন অনুযায়ী আরও চিকিৎসক দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অনেক বেশি। অনেক জায়গায় নির্ধারিত শয্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। তাই শয্যা, খাবার ও চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সহজ করতে হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সুবিধা সম্প্রসারণের কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ৫০টি এবং সদর হাসপাতালের জন্য আরও ৫০টি ডায়ালাইসিস মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি জেলাতেই এভাবে ডায়ালাইসিস সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে চিকিৎসার জন্য রোগীদের ঢাকাসহ বড় শহরমুখী চাপ কমবে।
হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত থাকা ১০ শয্যার আইসিইউ কার্যকরভাবে চালু না হওয়ার বিষয়টিও মন্ত্রীর নজরে আনা হয়।
এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত আইসিইউ চালুর আশ্বাস দেন তিনি। গুরুতর রোগীদের জেলা পর্যায়েই উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।

পরিদর্শনের সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই হাম রোগীর অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাদের শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর অসুস্থতা দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি।
একই সঙ্গে তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি হবিগঞ্জ থেকে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্সে সিলেটে পাঠানোর ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেন মন্ত্রী।
এ সময় হাম প্রতিরোধে টিকাদান ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। আগামী তিন সপ্তাহ পর সারাদেশে আবারও হাম প্রতিরোধে টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শিশুদের যথাযথভাবে টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মায়েদের সচেতনতা বাড়ানো এবং নবজাতককে শালদুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করাও জরুরি।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের কার্যক্রমের জন্য সদর হাসপাতালের দুটি তলা ব্যবহৃত হওয়ায় রোগীদের জায়গা সংকটের বিষয়টিও মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়।
জবাবে তিনি জানান, মেডিকেল কলেজের জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে। জায়গা চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিদর্শনকালে সম্প্রতি হবিগঞ্জে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগের বিষয়টিও মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়। অভিযোগটি তদন্তে কমিটি গঠন করা হলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন তার কাছে পৌঁছেনি বলে জানান তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এ ছাড়া হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের সাময়িক বরখাস্তকৃত মেডিক্যাল অফিসার ডা. মেহেদী হাসান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়ার কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন এবং রোগীদের ভোগান্তি কমাতে চিকিৎসাসেবা, ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এ সময় হবিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক আহমেদ আলী মুকিব, জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আমিনুল হক সরকার, হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. জাভেদ জিল্লুল বারীসহ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।